Our Sherpur

ঝগড়ার চর বাজার নামকরণ | হারুনুর রশীদ

পাখি চোখে ঝগড়ার চর বাজার

ঝগড়ার চর বাজার নামকরণের পেছনে আছে জমিদারি তোলাবাটি শোষণের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের ইতিহাস। ১৭২২ সালে চাকলা-পরগনা থেকে ব্রিটিশ জমিদারি প্রথায় প্রজা নিপীড়ন, উচ্চ রাজস্ব আদায় ও প্রতিবাদে হাটবাজার বয়কট। শেরপুর-নালিতাবাড়ি অঞ্চলে গড়ে ওঠে হাতিপাগার, রাজগঞ্জ ও ঝগড়ার চর বাজার। ‘আন্দোলন’ লোকমুখে হয় ‘ঝগড়া’।

ঝগড়ার চর বাজার নামকরণ ও হাটের তোলাবাটি আন্দোলন

হারুনুর রশীদ: ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান বঙ্গরাজ্যে “চাকলা” ও “পরগনা” প্রথা চালু করেন। চাকলার অধিপতিগণ “চাকলাদার” এবং পরগনার অধিপতিগণ “পীর” ও “জমিদার” পদবি লাভ করেন। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের অধীনস্ত হয় বাংলা। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে চাকলা প্রথার বিলুপ্তি ও জেলা প্রথা চালু হয়।

আমাদের এই শেরপুরসহ বৃহত্তর এলাকায় ময়মনসিংহ জেলাকেন্দ্রীক শাসনব্যবস্থা চলে। “পরগনা” প্রথার পরিবর্তন করে “এস্টেট” প্রথা চালু করে”। কিন্ত ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে এবং লোকমুখে “পরগনা” কথাটি প্রচলিত থাকে। বরং কাগজে কলমে “এস্টেট” শব্দটি প্রচলিত হলেও খুব একটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। তবে “জমিদারি” প্রথা চালু থাকে।

শুরু থেকেই এই “জমিদারি” প্রথা বঙ্গরাজ্যে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। প্রজাদের শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের ষোলকলা পূর্ণ করে। কেন্দ্রীয় সরকার মাঝে মাঝে জনস্বার্থে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন পাস করে। চতুর জমিদাররা নিত্যনতুন অপকৌশল অবলম্বন করে। এসব আইনের ফাঁকফোকরে নতুন নতুন প্রথা চালু করতে থাকে। এসব প্রথার একটি হাটবাজার ব্যবস্থাপনা।

শেরপুরের জমিদারদের প্রজাশোষণ ও আয়ের অন্যতম উৎস ছিলো হাটবাজার থেকে তোলাবাটি বা রাজস্ব আদায়। সাধারণত নদী বা খালের ধারে সহজেই হাটবাজার গড়ে উঠতো। এসব হাটবাজার নিয়ন্ত্রণ করে কোথাও সরাসরি আবার কোথাও ইজারাদারের মাধ্যমে উচ্চ হারে মাশুল আদায় করতো। কোনো কোনো হাটবাজারে বাৎসরিক রাজস্ব ২০ থেকে ২৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

প্রতিবাদে জনসাধারণ জমিদারদের হাটবাজার বয়কট করতে থাকে। কোথাও কোথাও নিজেরাই হাটবাজার বসাতে থাকেন। নালিতাবাড়ির “হাতিপাগার” হাট বসানো উল্লেখযোগ্য। নালিতাবাড়ির রাজনগর “বড় বন্দর বাজার” ভেঙ্গে কাছেই মালিঝী নদীর তীরে “রাজগঞ্জ বাজার” নামে প্রতিষ্ঠিত করে। বর্তমানে এটি “তিন আনী বাজার” নামে সর্বাধিক পরিচিত। উল্লেখ্য, সেই আমলে ঝিনাইগাতী থানা বা উপজেলা ছিলো না। “তিন আনী বাজার” নালিতাবাড়ি থানার অন্তর্গত ছিলো।

এছাড়াও বর্তমান ইসলামপুর উপজেলার কড়ইতলা খাল/নদীর তীরে হাটবাজার বসতো। জমিদার বিরোধী আন্দোলনের ফলে সেই বাজার ভেঙ্গে বেশ কিছু দূরে দশানী নদীর এক চরে নতুন একটি বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই আমলে “আন্দোলন”, “সংগ্রাম” শব্দগুলো তৃণমূলে খুব একটা পরিচিত ছিলো না।

জনসাধারণ আন্দোলন, সংগ্রামকেও এক প্রকার ঝগড়া-বিবাদ বলেই মনে করতো। যার ফলে লোকমুখে বাজারের নামকরণ হয়ে যায় ঝগড়ার চর বাজার। এই ঝগড়ার চর বাজারটি বর্তমানে শ্রীবরদী উপজেলার অন্তর্গত।

ঝগড়ার চর বাজার নামকরণ তথ্যসূত্র

  • ময়মনসিংহের বিবরণ, শ্রী কেদারনাথ মজুমদার
  • ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার (প্রথম খণ্ড), শ্রীশৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
  • সেরপুর বিবরণ, শ্রী হরচন্দ্র চৌধুরি
  • শেরপুর জেলার অতীত ও বর্তমান, পণ্ডিত ফছিহুর রহমান
  • শেরপুরের ইতিকথা, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন
  • ভারতের কৃষক সমস্যা, মুজাফফার আহমদ।
  • যে সংগ্রামের শেষ নেই, প্রমথ গুপ্ত
  • মোমেনশাহী উপাখ্যান, অমর মিত্র
  • ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, হাসান আলী চৌধুরী
  • আসাম ও কামরূপে মুসলমানদের হাজার বছর, সরদার আবদুর রহমান
  • বাংলা ও বাঙালীর বিবর্তন, ড. অতুল সুর
  • বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা শেরপুর, প্রধান সম্পাদক শামসুজ্জামান খান

Leave a Reply

Scroll to Top