প্রথম প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট: ৯ আগস্ট, ২০২৬
গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা শান্ত ও সবুজে ঘেরা প্রিয় শেরপুর জেলা। তুলশীমালা চালের ঘ্রাণ, নদী, পাহাড় ও পর্যটন, বাঙালী ও আদিবাসী সংস্কৃতিতে পূর্ণ অপার সম্ভাবনার শেরপুর। সীমান্ত জেলা হওয়ার কারণে নেই কোলাহল বা পরিবেশ দূষণের মতো কোন আয়োজন। এই অঞ্চলের মানুষের সরলতা মুগ্ধ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের। অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্ম হয়েছে এই শেরপুরে। জেলার ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান, বিখ্যাত খাবার ও যাতায়াত সহ শেরপুরের সব পাবেন এই পোস্টে।
এক নজরে শেরপুর জেলা – কুইক ফ্যাক্ট
রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২০৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বাংলাদেশের ৬১তম জেলা শেরপুর । একসময় জামালপুর মহকুমার অংশ থাকলেও ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কৃষি, তুলশীমালা চাল ও প্রাকৃতিক পর্যটনের জন্য বিখ্যাত এই জেলার ব্র্যান্ডিং স্লোগান – “পর্যটনের আনন্দে তুলশীমালার সুগন্ধে”।
শেরপুর জেলার সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বিভাগ | ময়মনসিংহ |
| আয়তন | ১,৩৬৩.৭৬ বর্গ কিলোমিটার |
| আন্তর্জাতিক সীমানা | ৩০ কিলোমিটার |
| জনসংখ্যা | ১৫,০১,৮৫৩ জন (আদমশুমারি ২০২২) |
| জনঘনত্ব | ১,১০২ জন / বর্গ কিমি |
| উপজেলা | ৫ টি (শেরপুর সদর, নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী) |
| পৌরসভা | ৪ টি |
| ইউনিয়ন | ৫২ টি |
| গ্রাম | ৬৭৮ টি |
| শিক্ষার হার | ৬৩.৫৭% |
| ব্র্যান্ডিং পণ্য | সুগন্ধি তুলশীমালা চাল |
| জাতীয় সংসদ আসন | সংসদীয় আসন ১৪৩ শেরপুর-১ (শেরপুর সদর), সংসদীয় আসন ১৪৪ শেরপুর-২ (নকলা, নালিতাবাড়ী), সংসদীয় আসন ১৪৫ শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী) |
| ডাক কোড | ২১০০ |
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ২০২২ ও শেরপুর জেলা প্রশাসন ওয়েবসাইট।
নামকরণ ও ইতিহাস: দশকাহনিয়া থেকে শেরপুর
শেরপুর নামের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের নাম ছিল দশকাহনিয়া বাজু। মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮০ সালে তাঁর সভাসদ টোডর মল্লকে বাংলার ভূমি বন্দোবস্তের জন্য পাঠান। তিনি সুবা বাংলাকে ২৪টি সরকারে ভাগ করেন এবং করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী অঞ্চলের নাম রাখেন সরকার বাজুহা। এই সরকার বাজুহাকে আবার ৩২টি মহাল বা পরগনায় ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নাম হয় দশকাহনিয়া বাজু। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে আবুল ফজল রচিত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থেও শেরপুরকে দশকাহনিয়া নামেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এরও অনেক আগে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক হিউ-এন-সাং (৬২৯-৬৪৫) তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে উল্লেখ করেন যে, তিনি পৌন্ড্র থেকে বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে কামরূপ রাজ্যে আসেন। তখনকার বঙ্গভূমি ৬টি প্রধান রাজ্যে বিভক্ত ছিল – পৌণ্ড্র, কামরূপ, সমতট, কমলাঙ্গ, তাম্রলিপ্ত ও কর্ণসুবর্ণ। কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত একটি উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল এই শেরপুর। পরবর্তীতে দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে এই দশকাহনিয়া বাজুই আজকের শেরপুর জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
নামকরণের ইতিহাস: দশকাহন ও শের আলী গাজী
শেরপুরের নামকরণ নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। শেরপুরের ইতিকথা গ্রন্থে অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনের মতে, পূর্বকালে ব্রহ্মপুত্র নদ অনেক প্রশস্ত ছিল। জামালপুর থেকে শেরপুর যেতে খেয়া নৌকায় পার হতে হতো এবং এর ভাড়া ছিল দশকাহন কড়ি। সেই থেকেই মহালের নাম হয় দশকাহনিয়া। অন্য মতে, এই অঞ্চলের প্রজাদের উপর দশকাহন কড়ি খাজনা ধার্য ছিল বলে এমন নামকরণ হয়েছে।
তবে সবচেয়ে প্রচলিত মতটি শের আলী গাজীকে ঘিরে। গাজী বংশের শেষ জমিদার ছিলেন শের আলী গাজী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, প্রজাহিতৈষী ও স্বাধীনচেতা শাসক। তিনি দীর্ঘ ২১ থেকে ২৪ বছর শাসন করেন। এক পর্যায়ে তিনি নবাব ও মুঘল সম্রাটকে খাজনা দেওয়া বন্ধ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দশকাহনিয়া বাজুর নতুন নামকরণ করেন শেরপুর। এই নামটি তাঁর নিজের নাম অনুসারেই রাখা হয়। যদিও পরবর্তীতে কূটকৌশলে তিনি জমিদারি হারান, কিন্তু শেরপুর নামটি স্থায়ীভাবে রয়ে যায়।
জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলা
প্রশাসনিক বিবর্তনে শেরপুর দীর্ঘদিন জামালপুর জেলার একটি মহকুমা হিসেবে পরিচালিত হতো। অবশেষে ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেরপুর মহকুমা থেকে জেলার মর্যাদা লাভ করে। জেলা হওয়ার পর ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটি ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ময়মনসিংহকে বিভাগ করা হলে শেরপুর ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
বর্তমান শেরপুর জেলার মোট আয়তন ১,৩৬৩.৭৬ বর্গকিলোমিটার। এখানে ৫টি উপজেলা এবং ৪টি পৌরসভা রয়েছে। শেরপুর শহর রাজধানী ঢাকা থেকে ২০৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং ময়মনসিংহ শহর থেকে ৬৭ কিলোমিটার উত্তরে গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ‘পর্যটনের আনন্দে তুলশীমালার সুগন্ধে’ স্লোগান গ্রহণ করা হয়েছে। তুলশীমালা চাল ও ছানার পায়েস জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় জেলার ব্র্যান্ডিং আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও নদ-নদী
গারো পাহাড়ের পাদদেশে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরের উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য আর দক্ষিণে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি – এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্যই শেরপুরকে আলাদা করেছে। জেলার মোট ১৩টি নদ-নদী এই জনপদের প্রাণ, প্রকৃতি ও আবহমান জীবনের সঞ্জীবনী ধারা হিসেবে বয়ে চলেছে। বর্ষায় পাহাড়ি ঢল আর শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধার কেন্দ্রা হলো এই নদীগুলো।
সীমানা ও গারো পাহাড়
শেরপুর জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম গারো পাহাড়। পেটি বন্ধনীর মতো সীমান্তরেখা ঘিরে রেখেছে এই পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর সর্বোচ্চ নকরেক গিরিশিখরের উচ্চতা ৪,৬৫২ ফুট। এই নকরেক শিখর থেকেই শেরপুর জেলার প্রধান পাহাড়ি নদীগুলোর উৎপত্তি। গারো পাহাড়ের অসংখ্য ছড়া, ঝর্ণা ও পর্বতগাত্র ধোয়া বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক নিয়মে সমতলে নেমে আসে, ফলে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়।

শেরপুরের ১৩ টি নদী
শেরপুরে ১৩টি নদী রয়েছে। এগুলো হলো – পুরাতন ব্রহ্মপুত্র [জেলার একমাত্র নদ], কংস, ভোগাই, কর্ণঝরা, চেল্লাখালি, ঝিনাই, দুধদা, মহারশি, মালিঝি, সোমেশ্বরী, মিরগী ও দশানি। এছাড়া খলং এবং কালাগাঙ এখন মৃত নদী।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোগাই নদী। একে নালিতাবাড়ীর প্রাণ বলা হয়। ভারতের মেঘালয়ের নকরেক গিরিশিখর থেকে ছয়টি বৃহৎ ঝর্ণা – দুধবান্দা গিরি, সান্দং, লোগা, চান্দাপাড়া, বান্দাপানী ও ভগী গিরির অসংখ্য ঝরনাধারা বুকে নিয়ে ভোগাই প্রবাহিত হয়েছে। সুদূর অতীতে এর নাম ছিল ভোগবতী। এটি পানিহাটা, তারানি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে নালিতাবাড়ীকে দুই ভাগে ভাগ করেছে এবং ভাটিতে কংস নাম ধারণ করে মগড়া, ঘোড়াউত্রা ও মেঘনার মোহনার দিকে গেছে।
ভোগাইয়ের শাখা নদী হলো গাঙ্গিনা, বুড়ি ভোগাই ও দর্শা। এর করনদী হলো তোতাপানি, সোপানু, বড়ঝোড়া, মেলেং, সঙ্গতিঝোড়া। একসময় এই নদীতে বাণিজ্যতরী চলতো। দেশভাগের আগে তুরা শহরের সাথে ধান, পাট, তামাক, চ্যাপা শুটকি, কাঠ ও সুপারির বড় মোকাম গড়ে উঠেছিল এই নদীকে ঘিরে। মহারশি ও সোমেশ্বরী নদী দুটিও গারো পাহাড় থেকে উৎপন্ন একই বৈশিষ্ট্যের খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, যা শেরপুরের উত্তর সীমান্তের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের মূল উৎস।
মৃত নদী খলং ও কালাগাঙ: শেরপুরের ১৩টি নদীর মধ্যে খলং এবং কালাগাঙ এখন মৃত নদী হিসেবে পরিচিত। একসময় প্রবাহমান থাকলেও বর্তমানে নাব্যতা সংকট, দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং রাবার ড্যাম ও নদী শাসনের ফলে এদের অস্তিত্ব সংকটে। ভোগাই, বুড়ি ভোগাই ও দর্শার মতো জীবিত নদীগুলোও একই কারণে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।
প্রশাসনিক কাঠামো – ৫ উপজেলা
৫ টি উপজেলা, ৪ টি পৌরসভা ও ৫২ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত শেরপুর জেলা। প্রতিটি উপজেলার আলাদা গল্প ও বৈশিষ্ট্য আছে, যা শেরপুরকে বৈচিত্র্যময় করেছে। চলুন একটু জেনে নেওয়া যাক জেলা উপজেলা সম্পর্কে-
১. শেরপুর সদর উপজেলা – জেলার প্রাণকেন্দ্র
শেরপুর জেলা শহরকে ঘিরে অবস্থিত শেরপুর সদর উপজেলা। প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা ও বিখ্যাত মন্ডা-ছানার পায়েসের জন্য সদর জনপ্রিয়। এটি আবাসিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। শহরের পাশেই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, জমিদার বাড়ী, মাইসাহেবা মসজিদ, গড় জরিপা, বারদুয়ারী মসজিদ, পৌরপার্ক ও ডিসি লেক অবস্থিত।
২. নালিতাবাড়ী উপজেলা – বাঁধ ও সেতুর উপজেলা
ভোগাই নদীর উপর নির্মিত জেলার প্রথম রাবার ড্যাম ও দৃষ্টিনন্দন ভোগাই সেতুর জন্য বিখ্যাত নালিতাবাড়ী। কৃষি নির্ভর এই উপজেলায় প্রচুর চাষ হয় মাল্টা, আনারস ও রাবার। পর্যটক আকর্ষিত পানিহাটা ও মধুটিলা ইকোপার্ক নালিতাবাড়ীতেই অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সেই সোহাগপুর বিধবা পল্লীও এখানে। ভারতের সাথে বাংলাদেশ সীমান্তে নাকুগাও স্থলবন্দর নালিতাবাড়ীর পরিচিতিকে নিয়ে গেছে অনন্য পর্যায়ে।
৩. ঝিনাইগাতী উপজেলা – পর্যটন রাজধানী
ঝিনাইগাতীকে বলা হয় শেরপুরের পর্যটনের রাজধানী। আদিবাসী সংস্কৃতি, গজনী অবকাশ, রাবার বাগান, আগর বাগান ও গারো পাহাড়ের সবুজে ঘেরা সৌন্দর্য এই উপজেলায়। এখানে পর্যটকের ঢল নামে শীতকালে। গড়ে উঠছে ব্যক্তি কেন্দ্রিক রিসোর্ট ও কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম।
৪. শ্রীবরদী উপজেলা – পাহাড় ও সমতলে গড়া
হারিয়াকোনা পাহাড় আর রাজার পাহাড়ের সৌন্দর্য অনন্য করেছে শ্রীবরদী উপজেলা। এই উপজেলা পাহাড় ও সমতলে গড়া প্রাকৃতিক সংমিশ্রণ।
৫. নকলা উপজেলা – সবজির রাজ্য
আয়তনে সবচেয়ে ছোট হলেও ধান ও সবজি উৎপাদনে এগিয়ে নকলা উপজেলা। চন্দ্রকোনা ও নারায়নখোলার মতো পুরনো ব্যবসা কেন্দ্র ও নৌ-বন্দর নকলার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
শেরপুরের পর্যটন – যেখানে গেলে মন ভালো হয়
পর্যটনের দিক থেকে শেরপুরকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
১. সমতলের শেরপুর জেলা
২. পাহাড়ের শেরপুর জেলা
পাহাড় দেখতে হলে যেতে হবে উত্তর দিকে, আর ইতিহাসের স্বাদ নিতে দেখতে হবে শহরের আশেপাশে। তাই পর্যটকের ভ্রমণ সুন্দর ও শৃঙ্খল করতে পর্যটনের শেরপুরকে ৩ ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। সিদ্ধান্ত
প্রকৃতি ও ইকো ট্যুরিজম – গারো পাহাড়
শেরপুর জেলার উত্তরে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী জুড়ে রয়েছে পাহাড় ও সবুজের সমারোহ। যা সকল ক্লান্তি ভুলিয়ে মন ভালো করে দেয় সকলের।

১. গজনী অবকাশ কেন্দ্র
ঝিনাইগাতী বাজার থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পিচঢালা রাস্তায় আগালেই শুরু হয় গারো পাহাড়। এখানে ৯০ একর জায়গা জুড়ে রয়েছে গজনী অবকাশ। যা ১৯৯৩ সালে শেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। চলছে সরাসরি প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে।
সবুজ গাছপালা, ছোট-বড় টিলা, উপজাতীয়দের ঘরবাড়ি পাশাপাশি ওয়াচ ভিউ টাওয়ার, ডায়নোসরের প্রতিকৃতি, মৎস্যকন্যা, মিনি চিড়িয়াখানা, ঝুলন্ত ব্রীজ আর আলোকের ঝর্ণাধারা ও প্যাডেল বোট ভুলিয়ে দেয় সকল ব্যস্ততা আর দুশ্চিন্তা। সময়গুলো কেটা যায় প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব করে।
শেরপুর জেলা শহর খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর থেকে রিজার্ভ সিএনজি করে ২৫০-৩০০ টাকায় সোজা চলে যেতে পারবেন গজনী আবকাশে। ভ্রমণের জন্য শীতকাল বেস্ট।
সকালের দিকে ক্যাবেল কার ও ঝুলন্ত ব্রীজে উঠলে সুন্দর ছবি তোলতে পারবেন। বিকাল ৪ টায় ওয়াচ টাওয়ারে উঠলে তুরা পাহাড় ও মেঘালয় দেখা যায়। খাবারদাবার শহর থেকে যাওয়ার সময়ই সাথে করে নিয়ে যেতে হবে অথবা রান্না করে খেতে হবে।

২. মধুটিলা ইকোপার্ক
গজনী থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে মধুটিলা, কিন্তু ভিড় অর্ধেক। যারা নিরিবিলি পছন্দ করেন, তাদের জন্যই মধুটিলা। ৩৮৩ একর সংরক্ষিত বন, হরিণ, বানর। এখানে একটা ১০০ ফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ার আছে যেখান থেকে ভারতের সীমান্ত দেখা যায়। ভাগ্যভালো হলে ওয়াচ টাওয়ার থেকেই বিকেলের দিকে মিলতে পারে বন্য হাতির দেখা। স্টার ব্রীজে উঠে খরগোশ কোলে নিয়ে ছবি তোলতে পারবেন অল্প টাকার বিনিময়ে।
গজনী থেকে অটো বা সিএনজিতে করে জনপ্রতি ভাড়া খরচ হবে ৪০-৫০ টাকা।

৩. পানিহাটা-তারানি পাহাড়
নালিতাবাড়ীর শেষ প্রান্তে, যেখানে পাকা রাস্তা শেষ, সেখান থেকে পানিহাটার আসল অ্যাডভেঞ্চার শুরু। সামনেই ভারত সীমান্ত, ব্রিজের উপর দিয়ে বিএসএফের ছুটে চলা। বর্ষায় টিলা বেয়ে ছোট ঝর্ণা নামে, ভোগাই নদী থেকে পানিহাটাকে আমাজন বনের মতো মনে হবে।
টিপস – বর্ষায় নয়, শুকনো মৌসুমে দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করুন।

৪. হারিয়াকোনা পাহাড়
হাইকিং প্রিয়দের জন্য শ্রীবরদী উপজেলার হারিয়াকোণা পাহাড়। যেখানে পাকা রাস্তা শেষ হয় সেখান থেকে শুরু হয় পাহাড়ী সীমানা। প্রতিটা টিলাই একটা থেকে সৌন্দর্যের দিক থেকে আলাদা। বর্ষায় পাহাড় থেকে সবুঝে ভরপুর এবং পরিচ্ছন্ন। তবে গাইড ছাড়া না যাওয়ার পরামর্শ রইল।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী
শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসগুলো জানতে চাইলে শেরপুর জেলা হবে অন্যতম পছন্দ। মসজিদ থেকে শুরু করে জমিদার বাড়ি কি নেই শেরপুর জেলায়?
মাইসাহেবা মসজিদ
শেরপুর জেলা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত ২৫০ বছরের পুরোনো মাইসাহেবা মসজিদ। একসাথে ৬ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করে এই মসজিদে। মসজিদের সৌন্দর্যই মন নরম করে দেয় প্রার্থনা করার জন্য। এই মসজিদের নামকরণে রয়েছে কিংবদন্তি। মাইসাহেবা মাসজিদ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আলাদা আর্টিকেল।
শেরপুর সরকারি কলেজ সংলগ্ন অবস্থিত মাই সাহেবা মসজিদ।
জমিদার বাড়ি
শেরপুর শহরের ভেতরে তিন জমিদারের নয়আনী, আড়াইআনী, পৌনে তিনআনী তথা তিন বাড়ি।
রামনাথের তিন পুত্র। রামনাথ মৃত্যুর পর তার জমিদারীর ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে অনেক গোলমাল হয়, মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়। পনের বছর গোলমালের পর জমিদারী আড়াই আনী, তিন আনী, পনে তিন আনী, নয় আনী হিস্যায় ভাগ হয়। পৌনে তিন আনী জমিদার বাড়ি এখন কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। এছাড়াও শেরপুর জেলা প্রশাসন কর্মকর্তাদের বাসভবন।
গড়জরিপা বারদুয়ারী মসজিদ
শেরপুরের গড় জরিপা বারদুয়ারী মসজিদ ৭০০ বছরের প্রাচীন। শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী হযরত জরিপ শাহ (রহ.)-এর ৩৬০ একর খানকা, জিনের খনন করা কালিদহ সাগর আর মাটিচাপা পড়া টিলার ভেতর থেকে উঠে আসা ১২ দরজার অলৌকিক মসজিদের পুরো রহস্য এখানে।
ধর্মীয় ও লোকজ স্থান
শেরপুর জেলায় ধর্মীয় ও লোকজ স্থানের উপস্থিতি উল্লেখ যোগ্য। নিচে প্রসিদ্ধ কয়েকটা লোকজ স্থানের বর্ণনা করা হলো-
শের আলী গাজীর মাজার
ইতিহাস প্রিয়দের জন্য গাজীর মাজার। শেরপুর জেলা শহর থেকে একটু দূরে গাজীর খামারে, যেখানে রাজপ্রাসাদ শেষ, সেখানেই এক অন্য ইতিহাস। শেরপুরের নামই হয়েছে শেষ গাজী বংশের জমিদার শের আলী গাজীর নামে, আগে এই অঞ্চলের নাম ছিল দশকাহনিয়া বাজু। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শের আলী খামারবাড়িতে সুফি সাধনায় মগ্ন ছিলেন এবং এখানে তার মাজার রয়েছে।
নোট: প্রতি বছর ১-৫ ফাল্গুন ওরশ হয় তাই দেখে আসুন মাজার নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও কাণ্ডকীর্তি।
সুতানাল দীঘি
নালিতাবাড়ী থেকে ৮ কি.মি. দূরে কাঁকরকান্দির মধ্যমকুড়া গ্রামে রয়েছে ৬০ একরের বিশাল সুতানাল দীঘি, স্থানীয়দের কাছে এটি কমলা রানীর দীঘি নামে পরিচিত। এক রাতে চরকায় সুতা কেটে যতটা জায়গা ঘেরা যায় তত বড় দীঘি খননের কিংবদন্তি থেকে নাম সুতানাল। লোককথা বলে, গঙ্গা পূজার সময় রানী কমলার সলিল সমাধির পর থেকে আজ পর্যন্ত এই দীঘির পানি কখনো শুকায় না, প্রচণ্ড খরাতেও টলটলে থাকে। দিনাজপুরের রামসাগরের পর সুতানালকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দীঘি বলে মানা হয়।
শীতকালে মাছ ধরার উৎসব দেখতে বেড়িয়ে যেতে পারেন।
বারোমারি খ্রিস্টান মিশন
নালিতাবাড়ীর শেষ সীমানায়, নাকুগাঁও স্থলবন্দর থেকে রাংটিয়া সড়ক ধরে একটু এগুলে পাহাড়ের ভাঁজে লুকানো ৩৯ একরের বারোমারি সাধু লিওর ধর্মপল্লি। ১৯৪২ সালে পর্তুগিজ আদলে গড়া এই মিশন ১৯৯৭ সাল থেকে ফাতেমা রাণীর তীর্থস্থান।
এখানে পাহাড় বেয়ে উঠে গেছে ১৬ টি ক্রুশের পথ, চূড়ায় তিন ক্রুশ আর যিশুর সমাধি। আর সবকিছুর উপরে ৪৭ ফুট উঁচু মা মরিয়মের মূর্তি, এটাই মূল আকর্ষণ। প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ বৃহস্পতি ও শুক্রবার ৫০ হাজার মানুষের মোমবাতির আলোয় পুরো গারো পাহাড় জ্বলে ওঠে।
টিপস – তীর্থ উৎসব ছাড়া যেতে চাইলে মিশনের অনুমতি নিয়ে যাবেন, আর মেলা থেকে ফেরার সময় গারোদের হস্তশিল্প নিয়ে যাবেন স্মৃতি স্বরূপ।
লেখক নোট: শেরপুর জেলার পর্যটনগুলো ২০২৬ সালে সরেজমিনে ভ্রমণ করেছে Our Sherpur টিম।
অর্থনীতি ও বিখ্যাত খাবার – শেরপুরের প্রাণ
শেরপুর জেলার অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর, তবে কৃষিই এখন ব্র্যান্ড। যে চাল একসময় শুধু জমিদার বাড়ির অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহার হতো, সেই চাল এখন ই-কমার্সের মাধ্যমে সারাদেশে বিক্রি হয়।

তুলশীমালা চাল – জেলা ব্র্যান্ডিং পণ্য
শেরপুরের নাম বললে যে সুগন্ধটা নাকে আসে, সেটা তুলশীমালার। ছোট, চিকন, সুগন্ধি এই চাল শেরপুর ছাড়া দেশের আর কোথাও ভালো হয় না। এর বিশেষত্ব – রান্নার পর ভাতের চেয়ে ঘ্রাণ বেশি হয়। পোলাও, খিচুড়ি, পায়েস, এমনকি সাদা ভাত হিসেবেও অতুলনীয়।
২০১৮ সালে জেলা প্রশাসন একে জেলা ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে শেরপুর তথা বাংলাদেশের জিআই স্বীকৃত একটি বিশেষ পণ্য। শেরপুর সদর, নকলা ও নালিতাবাড়ীর জমিতে বেশি চাষ হয় তুলশীমালার।
Our Sherpur নোট: আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে প্রিমিয়াম তুলশীমালা চাল সারা দেশে ডেলিভারি করছি।

শেরপুরের মন্ডা, ছানার পায়েস ও মালাই চপ
মুক্তাগাছার মন্ডা বিখ্যাত এটা সত্য। কিন্তু শেরপুরের মন্ডার স্বাদ আলাদা।
পার্থক্যটা কোথায়? মুক্তাগাছার মন্ডা শক্ত ও বেশি মিষ্টি, শেরপুরের মন্ডা নরম ও ছানার দানা মুখে পড়ে। শেরপুরের কারিগররা এখনো খাঁটি দুধের ছানা ও চিনির কড়া জ্বালে হাতে বানান। তাই শেরপুরের মন্ডা ২ দিনের বেশি ভালো থাকে না এটাই খাঁটির প্রমাণ।
আর শেরপুরের আসল জাদু হলো ছানার পায়েস ও মালাই চপ। ছোট ছোট ছানার বল দুধে ভেজানো। এই পায়েস শেরপুর ছাড়া আর কোথাও পাবেন না। যারা একবার খেয়েছে, তারাই জানে কেন ছানার পায়েস জিআই পণ্য। শেরপুর ও ঢাকায় ছানার পায়েস, মালাইচপের হোম ডেলিভারি চালু আছে আওয়ার শেরপুর থেকে।
চালের চাতাল শিল্প – নীরব অর্থনীতি
শেরপুরের অর্থনীতির চাকা ঘুরে ৪০০+ চালের চাতালে। বাংলাদেশের মোট সুগন্ধি চালের বড় অংশের যোগান দেয় শেরপুরের চাতালগুলো। প্রতিটি চাতালে ২০-৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন, তৈরি হয় কুঁড়া, তুষ থেকে গো-খাদ্য ও জ্বালানি। শেরপুরের চাল সারা দেশের বাজারে যায়।

ভাষা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংস্কৃতি – পাহাড়ের মানুষেরা
শেরপুর শহরে আপনি যে বাংলা শুনবেন, গারো পাহাড়ে গেলে সেই ভাষাই বদলে যাবে। ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীর পাহাড়ি গ্রামগুলোতে এখনো ৬ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের ভাষা, নিজেদের নিয়মে বসবাস করেন।
এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা গারোরা নিজেদের আচিক বলে পরিচয় দেন। তাদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক – সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় মেয়ে, পরিবারের প্রধান মা। তারা সাংসারেক, আচিক ও আবেং এই ৩ ভাষায় কথা বলেন। এরপর আছেন কোচ, হাজং, ডালু ও বানাই সম্প্রদায়। হাজংরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাদের নিজস্ব কৃষি উৎসব আছে। কোচ ও বানাইরা বাংলা ও নিজেদের ভাষা দুটোই বলেন।
শেরপুরের সংস্কৃতির সবচেয়ে রঙিন উৎসব হলো গারোদের ওয়াংগালা উৎসব। কার্তিক মাসে ফসল কাটার পর “১০০ ড্রামের উৎসব” হয়। মধুটিলা ও বাবেলাকোনা গ্রামে গেলে দেখবেন – পুরুষরা মাথায় পালক গুঁজে, মহিলারা আচিক পোশাকে নাচছেন, আর ১০০ টি ঢোল একসাথে বাজছে। এই উৎসবের মাধ্যমে সূর্য দেবতা মিসি সালজং এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরাই শেরপুরের আসল ঐতিহ্য। পাহাড় দেখতে গেলে তাদের হাতে বোনা কাপড়, তাদের ভাষাকে সম্মান করবেন আর সুযোগ থাকলে কিনে নিয়ে যাবেন।
শিক্ষা ব্যবস্থা – শত বছরের ঐতিহ্য
১৮৬৯ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষায় এগিয়ে শেরপুর। ব্রিটিশ আমলে এখানে গড়ে উঠেছিল উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা এখনো জেলার গর্ব।
জেলায় বর্তমানে ৪ টি সরকারি কলেজ রয়েছে – শেরপুর সরকারি কলেজ (১৯৬৪), শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ (১৯৭২), নকলা সরকারি হাজী জালমামুদ কলেজ (১৯৭২), শ্রীবরদী সরকারি কলেজ ও নালিতাবাড়ী সরকারি নাজমুল স্মৃতি কলেজ। উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত হাজারো শিক্ষার্থী কলেজগুলোতে পড়াশোনা করছে।
স্কুলের কথা বললে সবার আগে আসে জিকে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়-এর নাম। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল শেরপুরের সবচেয়ে পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী। এই স্কুলের মাঠ, লাল বিল্ডিং আর শতবর্ষী অ্যালামনাই শেরপুরের ইতিহাসের অংশ।
জেলায় শিক্ষার হার ৬৩.৫৭% (BBS ২০২২)। ২০+ কলেজ, ২০০+ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অসংখ্য মাদ্রাসা নিয়ে শেরপুরের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন বেশ সমৃদ্ধ।
কৃতি সন্তান – শেরপুরের গর্ব
শেরপুর সন্তানেরা দেশের নেতৃত্বতেও পিছিয়ে নেই।

রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেরপুরের কৃতি সন্তান। তিনি ১৯৬৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শেরপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ২৩ জুন তিনি ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে ৩ বছরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস শেরপুরে।
মুক্তিযুদ্ধে: বীর বিক্রম শহীদ শাহ মুতাসিম বিল্লাহ খুররম ও বীর প্রতীক জহুরুল হক মুন্সির জন্ম আমাদের শেরপুর জেলায়।
সাহিত্য ও শিক্ষায়: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ উপাচার্য ড. সৌমিত্র শেখর দে শেরপুরের সন্তান।
খেলাধুলায়: বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি শেরপুরের মেয়ে।
শেরপুরের সকল কৃতি সন্তানের পূর্ণ জীবনী পড়ুন এখানে – শেরপুরের বিখ্যাত ব্যক্তিদের পূর্ণ তালিকা
যাতায়াত, থাকা ও খাওয়া – প্র্যাকটিক্যাল গাইড
শেরপুর ভ্রমণ এখন অনেক সহজ। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে আসা যায় ৪-৫ ঘণ্টায়। অনলাইনে টিকিট বুকিং করা যায় আওয়ার শেরপুর অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে।
ঢাকা থেকে শেরপুর কিভাবে যাবেন
ঢাকার গুলিস্তান, মহাখালী থেকে সারাদিন শেরপুরের এসি ও নন-এসি বাস চলাচল করে। টিকিট সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনে হোয়াটসঅ্যাপ করতে পারবেন 01866065676 নাম্বারে, হটলাইন 09617854560
- বাস: শেরপুর রেড লাইন, সুপ্রীম কোচ, প্রাইম কমফোর্টার। নন-এসি ভাড়া ৫০০ টাকা, এসি ৬০০-৭০০ টাকা। ঢাকা টু শেরপুর যাতায়াতে সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা।
- রুট: ঢাকা – গাজীপুর – ময়মনসিংহ – শেরপুর। রাস্তা ৪ লেনের হওয়ার কারণে ভ্রমণ হয় আরামদায়ক। তবে মাওনা, ময়মনসিংহ সহ কিছু কিছু স্থানে ছোট ছোট জ্যাম লেগে থাকে।
- লোকাল যাতায়াত: শেরপুর শহর থেকে গজনী, মধুটিলা যেতে সিএনজি রিজার্ভ নিতে হয়। দিন চুক্তি ১২০০-১৫০০ টাকা।
টিপস: শেরপুরে কোনো রেল যোগাযোগ নেই, সবচেয়ে কাছের রেল স্টেশন জামালপুর। আর ঢাকা থেকে রাত ১২ টার বাসে উঠলে ভোরে শেরপুর পৌঁছে সারাদিন ঘুরতে পারবেন। যেকোনো হেল্প নিতে পারবেন আওয়ার শেরপুর হোয়াটসঅ্যাপে।
কোথায় থাকবেন ও খাবেন
শেরপুরে ফাইভ স্টার হোটেল নেই, তবে ভালো মানের আবাসিক হোটেল আছে।
- থাকা: হোটেল সম্পদ, হোটেল হোটেল আইসার ইন, হোটেল হেরিটেজ শেরপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এসি রুম ৮০০-২০০০ টাকা, নন-এসি ৬০০-১০০০ টাকা। গজনীতে সরকারি রেস্ট হাউস আছে, তবে ডিসি অফিস থেকে আগে বুকিং দিতে হয়।
- খাওয়া: শেরপুরের আসল মজা লুকিয়ে আছে খাবারে। শহরের নিউমার্কেট এলাকায় অনুরাধা মিষ্টান্ন ভান্ডার ও বুলবুল সড়কে চারু মিষ্টান্ন ভান্ডারে আসল মন্ডা, ছানার পায়েস ও মালাইচপ পাওয়া যায়। দুপুরে খাওয়ার জন্য হোটেল শাহাজান ও হোটেল স্টার, হোটেল মান্নান ভালো।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. শেরপুর জেলা কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?
শেরপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। এর আগে এটি জামালপুর মহকুমার একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে শেরপুরকে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে ঘোষণা করে।
২. শেরপুরের বিখ্যাত খাবার কি?
শেরপুরের বিখ্যাত খাবার হলো ছানার পায়েস, মন্ডা ও মালাইচপ। এর মধ্যে ছানার পায়েস সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া সুগন্ধি তুলশীমালা চাল বেশ জনপ্রিয়।
৩. শেরপুরে কি রেল যোগাযোগ আছে?
না, শেরপুর জেলায় সরাসরি কোনো রেল যোগাযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের কয়েকটি জেলার মধ্যে একটি যেখানে রেললাইন নেই। ঢাকা থেকে শেরপুর যেতে হলে সড়ক পথেই যেতে হয়। সবচেয়ে কাছের রেল স্টেশন হলো জামালপুর রেল স্টেশন, যা শেরপুর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে।
৪. শেরপুরের বিধবা পল্লী কোথায় অবস্থিত?
শেরপুরের বিধবা পল্লী নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে স্বামী হারানো প্রায় ৬২ জন বীরাঙ্গনা ও বিধবা নারী এখানে একসাথে বসবাস করেন। এটি বাংলাদেশের একমাত্র বিধবা পল্লী হিসেবে পরিচিত।
৫. শেরপুর জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য কি?
শেরপুর জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হলো সুগন্ধি তুলশীমালা চাল। ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসন একে ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এর স্লোগান হলো “পর্যটনের আনন্দে তুলশীমালার সুগন্ধে”। বর্তমানে এই চাল জিআই (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।
তথ্যসূত্র:
- শেরপুরের ইতিকথা, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন
- ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গড়জরিপা: প্রকৌশলী এম. আহসান আলী ও মো. আকরাম আলী
- শেরপুর জেলা, কিশোর কন্ঠ, ডিসেম্বর ২০১১
- সাবডিভিশন থেকে পূর্ণাঙ্গ জেলা: শেরপুরের ৪২ বছরে ইতিহাস। আরফান আলী। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- শেরপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আমাদের সময়, ০৩ জুন, ২০২২
- গজনী অবকাশ কেন্দ্র, ভ্রমণ গাইড ওয়েবসাইট

Thank you very much for the informative article. It help me very much about Sherpur.
শেরপুর নিয়ে বিস্তারিত লেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাদের।
All in one.