বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে ছোট্ট একটা জেলা শেরপুর। ‘পর্যটনের আনন্দে তুলশীমালার সুগন্ধে‘ স্লোগানকে ধারণ করে এই জেলার ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে। পর্যটকদের মাঝে শেরপুর পর্যটন এলাকাগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই ভ্লগে হারিয়াকোনা পাহাড় ভ্রমণ গাইড দেব যেন, দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে সহজে শ্রীবরদী ভ্রমণ তথা হারিয়াকোনা পাহাড় ঘুরে দেখতে পারেন ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকরা। এই গাইডে থাকছে হারিয়াকোনা পাহাড়ে যাওয়ার উপায়, ভ্রমণের সেরা সময়, কী দেখবেন, কোথায় খাবেন, নিরাপত্তা পরামর্শ, খরচ এবং গুরুত্বপূর্ণ টিপস।

শেরপুরের পাহাড়, লটকন বাগান আর প্রকৃতির অনন্য মিশ্রণ
যারা শেরপুর তথা দেশের উত্তর সীমান্তে প্রকৃতিক শান্ত সৌন্দর্য খুঁজছেন তাদের জন্য শেরপুর জেলার হারিয়াকোনা গ্রামটি হবে প্রথম চয়েস। এখানে নেই কৃত্রিম সজ্জা। যা আছে পুরোটাই প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই ধীরে ধীরে ভ্রমণের জনপ্রিয় পাহাড়ি স্পট হয়ে উঠছে হারিয়াকোনা পাহাড়। লটকন বাগান, পাহাড়, সবুজ বন, কাজু বাদাম বাগান, সীমান্তঘেঁষা পরিবেশ মুগ্ধ করবে আপনাদের।
অন্য রকম পরিবেশ হচ্ছে ছোট ছোট টিলার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে এই পাহাড়। ফলে এক টিলা থেকে আরেক টিলা দেখে হারিয়ে যেতে হয় প্রকৃতির মাঝে। একেকটা টিলার চরিত্র একেক রকম। কিছু অংশে গাছ নেই, রুক্ষ লাল মাটি। আবার কিছু অংশে ঘন সবুজের সমারোহ। এই বৈপরীত্যটাই চোখ জুড়িয়ে দেয়, মুগ্ধ করবে যে কাউকে। টিলার ফাঁকে ফাঁকে সবুজ ধানক্ষেত আর আঁকাবাঁকা মেঠো পথের দৃশ্য মুগ্ধ করে।

হারিয়াকোনা পাহাড় কোথায়?
শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি পাহাড়ি এলাকা হারিয়াকোনা। এটি ভারতের মেঘালয় সীমান্ত পাড়ে অবস্থিত। মূলত পাহাড়, বন ও কৃষিভিত্তিক জনপদের জন্য পরিচিত। শীত, বর্ষা ও গ্রীষ্ম মৌসুমে হারিয়াকোনার সৌন্দর্য ভিন্ন রূপ প্রকাশ পায়। অনেকে এই সৌন্দর্যকে শেরপুরের সুইজারল্যান্ড হিসেবে অবিহিত করে। প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে অনেকেই শুয়ে পড়েন পাহাড়ের বুকে।
হারিয়াকোনা পাহাড়ের উচ্চতা সমতল ভূমী থেকে অন্তত ১৫০০ ফিট উপরে। মানুষের পদচারণা কম হওয়ার কারণে প্রকৃতি এখনো অক্ষত রয়েছে।

কেন হারিয়াকোনা পাহাড় ভ্রমণ করবেন?
হারিয়াকোনার ভিউ শেরপুরের অন্য যেকোন পাহাড়ের চেয়ে আলাদা। ছোট ছোট টিলা দিয়ে গঠিত হওয়ার কারণে এক টিলা থেকে অন্য টিলার সৌন্দর্য অবলোকন করা যায় সহজে। এই ভিউ অন্য কোন পাহাড়ে না থাকার কারণে আপনার মন জুড়াবে।
পাহাড়ের চূড়ায় চাইলে ক্যাম্প করেও অবস্থান করা যায়। ফলে প্রহর অনুযায়ী সৌন্দর্যের পার্থক্য উপভোগ করা যাবে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য মন কাড়ে পর্যটকদের। বর্ষার সবুজ পাহাড়ি রূপ, শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ ভুলিয়ে দেয় শহুরে কোলাহল ও ব্যস্ততা। রিফ্রেশ করে নিজের মন, দেহ ও মস্তিষ্ক। এসব কারণেই হারিয়াকোনা পাহাড় ভ্রমণের জন্য ২০২৬ সালে বেস্ট চয়েস।
লটকন বাগান অতিক্রম করে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উঠতে উঠতে আবিষ্কার করবেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ফটোগ্রাফি ও ট্রাভেল ভ্লগের জন্য দারুণ একটি পাহাড়। টাটকা কাজু বাদাম দেখেছেন কখনো? তা পেয়ে যাবেন শ্রীবরদী হারিয়াকোনা পাহাড়ে।

খাড়া টিলা বেয়ে উপরে উঠার একটা এডভেঞ্চার রয়েছে। যা, অনেকটা লোক চক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও পরে আত্ম বেড়ে যাবে এবং সহজেই আনন্দের সাথে উঠে যাওয়ার তাড়না তৈরি হবে। এরপরই মিলবে বটবৃক্ষ। যেখানে বসে ছবি তুলতে পারবেন চমৎকারভাবে।

হারিয়াকোনা যাওয়ার উপযুক্ত সময়
অক্টোবোর থেকে ফেব্রুয়ারী মাসে মেঘ,ঠান্ডা অভহাওয়ায় পাহাড় বেয়ে উপরে উঠা যায় খুব সহজে। ক্লান্তি আসে না শরীরে। এছাড়া বেস্ট ভিউ পাওয়া যায়। যা চোখ জুড়ানোর পাশাপাশি ভিডিও এবং ফটোগ্রাফিতেও চমৎকার ফুটে উঠে। নিজের সৌন্দর্য বেড়ে যায় প্রকৃতির সাথে মিশে।
মার্চ থেকে মে মাসে গরম পরে কিন্তু ভিউ হয় অসাধারণ। আমি প্রথম ভ্রমণ করেছি ২০২৬ সালের মে মাসের ৮ তারিখে। গরম থাকলেও পাহাড়ি সৌন্দর্যের কারণে ডোপামিনে সিগনাল পায়নি গরমের। তবে আভহাওয়া মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি সময়টা। গরমে পানি সঙ্কট হওয়ার ভয় থেকে আমরা প্রচুর পানি নিয়ে হারিয়াকোনা পাহাড়ে পাহাড়ে উঠেছিলাম।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর বর্ষা মৌসুম হওয়ার কারণে ধুলাবালি পাওয়া যায় না একদমও। সেই সাথে গাছগাছালি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন থাকে। তাই দেখতে চমৎকার থাকে।

কীভাবে যাবেন হারিয়াকোনা?
ঢাকা থেকে শেরপুরগামী বাসে শ্রীবরদী বা শেরপুর শহরে নামতে হবে। বাসের টিকিট বুকিং করতে পারবেন আওয়ার শেরপুর ওয়েবসাইটে। শেরপুর শহরে নামলে প্রথমে খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর আসতে হবে। এরপর সেখান থেকে শ্রীবরদীর সিএনজিতে উঠতে হবে। তবে সরাসরি কর্ণজোড়ার সিএনজিও পাওয়া যেতে পারে। আর শ্রীবরদী নামলে প্রথমে কর্ণজোড়া এরপর মেঘাদল বাজার (শয়তান বাজার নামেও লোক মুখে পরিচিত) যেতে হবে। খাওয়ার চাহিদা থাকলে দিবা-রাত্রী হোটেলে খেয়ে নিতে পারবেন কম টাকায়। তবে সেখানের শুটকি মাছ তরকারি বেশ মজার। এরপর এখান থেকে বের হয়ে একটা অটো ভ্যানে করে চলে যাবেন হারিয়াকোনা পাহাড়ে। এরপর শুরু হয়ে যাবে আপনার হারিয়াকোনা পাহাড় ভ্রমণ।
তবে সবচেয়ে ভালো হয় স্থানীয় গাইড নিয়ে ঘুরতে বের হলে। যারা আপনাকে প্রতিটি আঁকাবাঁকা পথ নিয়ে যাবে। যা এককভাবে সম্ভব নয়। এছাড়াও জরুরী প্রয়োজন হলে গাইড খুব সহজে নিকটস্থ আদিবাসিদের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবে। আমি ভ্রমণের সময় ‘আওয়ার হারিয়াকোণা’ পেজের এডমিন মোঃ নিহাদ ভাইকে সাথে নিয়েছিলাম। আর নিহাদ ভাই স্থানীয় গাইড আলম হাসান ভাই, সোহাগ ভাই সহ আরও কয়েক জনকে সাথে রেখেছিলেন। ফলে আমাদের ভ্রমণ হয়েছে আনন্দঘন ও স্মরণীয়। তাই দূর থেকে কেউ ভ্রমণ গাইড খুজলে আলম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।

ভ্রমণ খরচ (আনুমানিক)
ঢাকা থেকে শেরপুর এসি বাসে ৬৫০-৭০০ টাকা আর নন এসি বাসে ৫০০ টাকা খরচ হয়। টিকিট বুকিং করতে পারবেন আওয়ার শেরপুর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপে 01866065676 নাম্বারেও। খোয়ারপাড় থেকে শ্রীবরদী সিএনজিতে জন প্রতি ৫০/-, এরপর কর্ণজোড়া পর্যন্ত অটোতে ৪০/-, মেঘাদল বাজার বা শয়তান বাজার ২০/- এবং সেখান থেকে অটো ভ্যানে ২-৩ কিলোমিটার জন প্রতি ৫০/- আর বাইকে গেলে ১০০/- খরচ করতে হয়। আর খাবার খাওয়ার সর্বশেষ হোটেল মেঘাদল বাজার।
কোথায় থাকবেন?
পাহাড়ের আশেপাশে থাকার কোন আবাসিক ব্যবস্থা নেই। তাই চলে আসতে হবে শেরপুর শহরে। থাকার জন্য শেরপুরের হোটেলের ক্যাটাগরি অনুযায়ী ৫০০-২৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে মেঘাদল বাজার একই রুটে ফিরে না এসে চাইলে পাশের রাজার পাহাড়, গজনী অবকাশ, মধুটিলা ইকোপার্ক, বা অন্যান্য পর্যটন এলাকাগুলো ভ্রমণ করতে পারবেন। আর শেরপুর থেকে বের হওয়ার সময় অর্কিড পর্যটন কেন্দ্রে ঢু মারতে পারবেন।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
যেহেতু এখানে অনেক হাঁটতে হয়, তাই ট্রেকিং এর জন্য ভালো গ্রিপের জুতা আর পর্যাপ্ত পানি সাথে নেবেন। পুরো এলাকা ঘুরে দেখতে একদিন যথেষ্ট নয়, তাই সময় নিয়ে আসবেন। প্রচুর রোদ আর বৃষ্টির সম্ভাবনা থেকে ছাতা ও পলিথিন সাথে রাখবেন। এটি সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় স্থানীয় গাইড ছাড়া না যাওয়াই ভালো। সবচেয়ে জরুরি বিষয়, দয়া করে প্লাস্টিক বা কোনো ময়লা ফেলে আসবেন না। এটা আমাদের শেরপুরের সম্পদ। আর সীমান্তের কাঁটাতারের কাছাকাছি গেলেও ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। BGB, BSF এর নির্দেশনা মেনে চলুন। এই ছিল হারিয়াকোনা পাহাড় ভ্রমণ সম্পূর্ণ গাইড।
