প্রথম প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট: ৩ আগস্ট, ২০২৬
১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট গারো পাহাড়ের পাদদেশে শেরপুরের ঝিনাইগাতীর নকশী বিওপিতে সংঘটিত নকশী যুদ্ধ শেরপুরের মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবময় ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। কিভাবে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি ঘাঁটির বিরুদ্ধে লড়ে ২৬ জন শহীদ হলেন তা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বইপুস্তকের তথ্য অনুসারে সাজানো হয়েছে এই আর্টিকেল।
নকশী কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা অঞ্চলের নাম নকশী। গ্রামটি ঝিনাইগাতী উপজেলার অন্তর্গত এবং সীমান্তের কাছে হওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সর্বদা এখানে নজর রাখত।
এ অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন। মুসলিম, গারো, খ্রিস্টান এবং নিম্ন বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়সহ সবাই যুদ্ধে অংশ নেয়। শেরপুরের মুক্তিযুদ্ধ জানতে হলে তাই নকশী যুদ্ধের ইতিহাস জানা অপরিহার্য।
নকশী যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: নীরেন্দ্র মারাকের যোগদান
নকশী অঞ্চলের যোদ্ধাদের একজন ছিলেন ২৫ বছরের যুবক নীরেন্দ্র মারাক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য তুরা রংনাবাগ শিবিরে চলে যান। তারপর তিনি নাজমুল আহসান কোম্পানিতে যোগ দেন। নাজমুল আহসান কোম্পানী ছিল মুক্তিযুদ্ধের ১১ নং সেক্টরের অধীনে।
নাজমুল আহসান কাঁটাখালী যুদ্ধে শহিদ হওয়ার পর নরেন্দ্র মারাক ঝিনাইগাতী অঞ্চলের যুদ্ধের সাথে অন্য কোম্পানিতে যোগ দেন।

নকশী বিওপি আক্রমণ: যেভাবে যুদ্ধ শুরু হয়
একদিন সন্ধ্যায় ভারতীয় পোড়াকাশিয়া আর্মি ক্যাম্প থেকে মেজর এসে বললেন নকশী যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে।
প্রায় ৫০-৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও হাকিম সুবেদারের নেতৃত্বে ইপিআর এর ২০-২৫ জন জোয়ান এবং ভারতীয় এক প্লাটুন সৈনিকসহ নকশী বিওপি আক্রমণের জন্য রওয়ানা হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা
ক্যাম্পের চারপাশ জঙ্গলে ঘেরা এবং ঘুটঘুটে অন্ধকার। উত্তর দিক ছাড়া সবদিক থেকে ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলা হয়। পাহাড়ের টিলায় ছিল হেভি মেশিনগান আর মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর হাতে এলএমজি, এসএলআর এবং এসএমজি। ভারতীয় সেনা ক্যাম্পে বসানো ছিল সিক্স পাউন্ডার মার্টারগান।
মাঝরাতে কমান্ডারের নির্দেশে ফায়ার শুরু করা হয় এবং পাকিস্তানিরাও পাল্টা জবাব দেয়। তীব্র গোলাগুলির একপর্যায়ে আহম্মদনগর পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে দুটি মার্টাল শেল এসে মুক্তিবাহিনীর ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। মুক্তিযোদ্ধারা ভীত হয়ে যায় এবং কমান্ডারের নির্দেশে ক্রলিং করে স্থান ত্যাগ করে।
পরদিন আহম্মদনগর থেকে শেরপুরে ১০ টি মুক্তিযোদ্ধার লাশ পাঠায় পাকিস্তানিরা। শেরপুরের রাজাকারগণ লাশগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। একই দিন কিছু পাকিস্তানি সেনাও আহত হয়। নকশীতে শহিদ হওয়া মুক্তিযোদ্ধারা সবাই টাঙ্গাইলের ছিল তাই তাদের পরিচয় লিপিবদ্ধ করা যায়নি।

আহম্মদনগর ক্যাম্প: নকশী যুদ্ধের পেছনের শক্ত ঘাঁটি
নকশী যুদ্ধ বুঝতে হলে আহম্মদনগর ক্যাম্প সম্পর্কে জানতে হবে।
আহম্মদনগর ছোট্ট একটি গ্রামের নাম, কিন্তু এ গ্রামকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হাতিপাগার, বারোমারি, নন্নী, হলদিগ্রাম, নকশী, বিওপি, তিতআনী এবং কয়রোডসহ অন্যান্য গ্রামগুলোতে অত্যাচারের জন্য শক্তিশালী সদর ঘাঁটি হিসেবে স্থাপন করেন আহম্মদনগর হাইস্কুলে।
অবস্থান: জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে, ঝিনাইগাতী থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং নালিতাবাড়ি থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে এ গ্রামের অবস্থান।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ক্যাম্পের নিরাপত্তার জন্য সর্বদা ৭০-৮০ জন জোয়ান মোতায়েন থাকতো। মাঠের মাঝখানে থাকতো বড় বড় মার্টার। ক্যাম্পে যেন মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বাঁশের চুক্কি ঘন ঘন করে অনেক দূর পর্যন্ত পুঁতে রাখা হতো। এছাড়াও কাঁটাতারের বেড়াও ছিল। মুক্তিযোদ্ধা যেন কোন ভাবেই ক্যাম্পে না আসতে পারে ক্যাম্পের চারপাশে Anti Personal মাইন পুঁতে রাখা হতো।
আহম্মদনগর ক্যাম্পের অত্যাচার
ক্যাম্প থেকে ২০-২৫ জন পাকিস্তানি আর্মি এবং স্থানীয় রাজাকারদের সমন্বয়ে গ্রামে লুটপাট, নিরীহ মানুষদের উপর নির্মমভাবে অত্যাচার করতো। তাদের কাছ থেকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান চাইতো এবং নারীদের উপর চালাতো নিপীড়ন-নির্যাতন। ভোগাই নদী থেকে শ্রীবরদী পর্যন্ত আহম্মদনগর মেজর রিয়াজের অধীনে ছিল।
নভেম্বর মাসে আহম্মদনগর হাইস্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ওমর আলী ও খালেক নামের ২ জন ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দুই ছাত্রের অপরাধ তাদের ভাই এবং বাবা মুক্তিযোদ্ধা, তাই তারা যে কোন সময় তথ্য পাচার করতে পারে মুক্তিবাহিনীর কাছে। রাজাকার সৈয়দুর রহমান ফুটি মিয়াকে সন্দেহের বশে হত্যা করে। এছাড়াও আরও বহু লোকজন হত্যা করে, তাদের কয়েকজনের নাম- কৈফুল বেগম, ওয়াজ উদ্দিন এবং একই পরিবারের ৩ জন মামুদ আলী, আবু মিয়া, ও সোরহাব আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীতে তালুকদার বাড়িসহ ৪-৫ টি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে আরও বহু বাড়িতে লুটপাট করে।
৩ আগস্টের নকশী যুদ্ধ ও শহীদদের তালিকা
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট, মঙ্গলবার। নকশীর বিওপিতে পাকবাহিনীর সাথে বড় রকমের সংঘর্ষ হয়। বহু মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে গিয়ে, তবে শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন আমীন আহমেদ চৌধুরীসহ ৩৫ জন আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান।
ঐদিন যাদেরকে বাংলা মায়ের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে তাদের নাম গুলো নিম্নে দেওয়া হলোঃ-
১. ল্যান্স নায়েক মো. ইউসুফ মিয়া
২. ল্যান্স নায়েক আবুল কালাম
৩. সিপাই ফয়েজ আহমদ
৪. সিপাই আব্দুস সাত্তার
৫. সিপাই শামসুজ্জামান
৬. সিপাই মো. সুজা মিয়া
৭. সিপাই হুমায়ুন কবীর
৮. সিপাই সিরাজুল হক
৯. সিপাই মোহাম্মদ আলী
১০. সিপাই মো. হানিফ
১১. সিপাই আব্দুস সালাম
১২. হাবিলদার নাসিরউদ্দিন।
নকশী যুদ্ধ শুধু একটি সীমান্ত যুদ্ধ নয়, এটি শেরপুরের মুক্তিযুদ্ধের সাহস, ত্যাগ ও সম্প্রীতির প্রতীক। যেখানে গারো, বাঙালি, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল। এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে।
আরও পড়ুন: সূর্যদী গণহত্যা ১৯৭১: ২৪ নভেম্বর শেরপুরের ৪৯ শহীদের ইতিহাস
নকশী যুদ্ধ কবে হয়েছিল?
নকশী বিওপিতে বড় সংঘর্ষটি হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট, মঙ্গলবার।
নকশী যুদ্ধে কতজন শহীদ হয়েছিলেন?
নকশী যুদ্ধে ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
আহম্মদনগর ক্যাম্প কোথায় ছিল?
ঝিনাইগাতী থেকে ৩ কিমি দক্ষিণে, নালিতাবাড়ি থেকে ১৬ কিমি পশ্চিমে এবং জেলা সদর থেকে ২০ কিমি উত্তরে আহম্মদনগর হাইস্কুলে এই ক্যাম্প ছিল।
তথ্য সূত্র
- মুক্তিযুদ্ধে শেরপুর, আবদুর রহমান তালুকদার
- মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস : শেরপুর জেলা, আল্ জাবির
