Our Sherpur

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও হত্যার ইতিহাস

রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

লেখকঃ ক্যাপ্টেন (অবঃ) মোঃ রফিকুল ইসলাম

প্রথম প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট: ৬ আগস্ট, ২০২৬

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিজয়ের দুইদিন আগে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে রায়ের বাজারে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। মুনির চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার সহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে দিনটি পালিত হয়। এটি মানবতার চরম লঙ্ঘন ও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল বর্বরতা।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপট: চূড়ান্ত বিজয়ের অপেক্ষা

ডিসেম্বর মাসেই পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাকিস্তান সরকার পরাজয় টের পেয়ে আমেরিকার সহায়তায় যুদ্ধ বিরতির চেষ্টা করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বারবার আমেরিকা যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব আনছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু থেকে ভারত ও রাশিয়া আমাদের জোরালো ভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাই আমেরিকার যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে রাশিয়া বারবার ভেটো দিচ্ছে।

জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করাতে না পেরে আমেরিকা তার সপ্তম নৌবহর চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাচ্ছে। রাশিয়াও পাল্টা বদলা নিতে তাদের নবম নৌবহর পাঠানোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ জোরালো হচ্ছে, যেন সপ্তম নৌবহর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।

আমাদের সম্মিলিত বাহিনী চারিদিক থেকে মুক্ত করে ঢাকাকে ঘিরে ধরেছে। আমরা সন্ধ্যা হতেই বিবিসি শোনার জন্য রেডিওর চারপাশে বসে থাকতাম। ওই সময় রেডিও ছিল খুব কম। আকাশবাণী, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার খবর শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। ঢাকা ঘেরাও করার পর পাকি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়। তাদের পতন তখন সময়ের ব্যাপার।

আমরা যেমন আনন্দিত তেমনি শঙ্কিতও ছিলাম। কারণ দেশের সব জেলা থেকে পালিয়ে পাকি বাহিনী ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছে। যদি সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তবে অগণিত জানমালের ক্ষতি হবে। তাদের পরাজয় যে নিশ্চিত তা তারা বুঝতে পেরেছে। পাকিস্তান থেকে রসদ সরবরাহ বন্ধ থাকায় তারা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে।

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী ফটোকার্ড

ছবি: ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১: বিবিসির সংবাদে স্তম্ভিত জাতি

খবর শুনে আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ছি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছে থাকা গুলি আকাশের দিকে তাক করে ফায়ার করে আনন্দ করছে। আমরা গুলির শব্দ শুনেই “জয় বাংলা” ধ্বনিতে মুখরিত করছি।

এর মাঝে ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ০৭:৩০ মিনিটে বিবিসির সংবাদ শুনে স্তম্ভিত হয়ে যাই। বর্বর পাকি বাহিনী তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদেশকে মেধা শূন্য করতে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার চক্রান্ত করে। আগে থেকেই এদেশীয় কুখ্যাত রাজাকারদের সহায়তায় বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে ১৪ ডিসেম্বর রায়ের বাজারে নিয়ে হত্যা করে। পৃথিবীতে এমন নিষ্ঠুর ও বর্বর ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নেই। বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে এরকম হৃদয় বিদারক ঘটনা সমগ্র জাতি তথা পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে যাদের আমরা হারিয়েছি

হত্যা করা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। তাঁদের মাঝে যাদের নাম মনে পড়ে তাঁরা হলেন – মুনির চৌধুরী, সিরাজ উদ্দিন হোসেন, আলীম চৌধুরী, সেলিনা পারভিন, আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লা কায়সার, ফজলে রাব্বী, সন্তোষ ভট্টাচার্য, ডাঃ ফজলে রাব্বী, ডাঃ মোর্তজা, ডঃ ফয়জুল মহী, ডঃ আমিনউদ্দিন, আবুল খায়ের, নিজাম উদ্দিন, রাশিদুল হাসান, গিয়াস উদ্দিন, এস এ মান্নান, আবদুল কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান, গোলাম মোস্তফা, সুখরঞ্জন সমাদ্দার সহ আরো অনেকে। আজকের এ দিনে সবাইকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

কেন ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলো? নীল নকশার কারণ

যুদ্ধেরও কিছু নিয়মনীতি আছে। যেমন যেকোনো যুদ্ধেই শিশু ও নারীরা অসহায়, তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা বা ধর্ষণ করা, নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিনা কারণে গণহত্যা করা যুদ্ধনীতির বহির্ভূত এক মানবতার চরম লঙ্ঘনীয় কাজ। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা যখন জানতে পারলো তাদের পরাজয় নিশ্চিত, তখনই তারা আত্মসমর্পণের দুইদিন আগে নির্বিচারে বুদ্ধিজীবী হত্যায় মেতে উঠলো। সুতরাং একে কখনো যুদ্ধ বলা চলে না। এটা যুদ্ধ থেকেও শতগুণ নিম্নস্তরের কাজ! এটা হলো কাপুরুষতা, গণহত্যা, হিংস্রতা, মানবতার চরম পরাজয়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশরা প্রায় দুশো বছরের রাজত্ব শেষে যাওয়ার সময় বিতর্কিত সীমানা নির্ধারণের মতো কিছু ঘৃণ্য কৌশল অবলম্বন করে, যাতে এই দুই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তাদের নিজেদের মধ্যে সমস্যাগুলো আজীবন থেকে যায়। যেমন কাশ্মীর সীমানা নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের সব সময়ের দ্বন্দ্ব।

ঠিক তেমনি এই বর্বর পাকিস্তানিরা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনেই ১৪ ডিসেম্বর এক নীল নকশা আঁকে। যাতে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে মেধাশূন্য হয়ে পড়ে এবং বিশ্ব দরবারে মাথা সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে।

এর পেছনের কারণগুলো হলো:

১. তারা যে অন্যায়, অবিচার আর গণহত্যা এখানে ঘটিয়েছে তা যেন বিশ্ব গণমাধ্যম, মিডিয়ায় যথাযথ ভাবে তুলে ধরার ব্যক্তিরা এদেশে জীবিত না থাকেন।
২. সঠিক ভাবে বিশ্বের কাছে প্রমাণ তুলে ধরে তাদের বিরুদ্ধে সঠিক বিচার চাইতে না পারেন।
৩. যাতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান যোগ্য ব্যক্তিদের অনুপস্থিতিতে মুছে যায়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্মৃতিসৌধ

ছবিঃ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে যে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়

বুদ্ধিজীবী হত্যার ফলাফল: জাতির অপূরণীয় ক্ষতি

আমরা হয়তো অনেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যার ফলাফলটা কিভাবে আমাদের দেশের উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করেছে তা চিন্তা করে দেখিনা। একজন সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী একটা দেশ, এমনকি পৃথিবীর অনেক দেশের ইতিহাস বদলে দিতে পারেন! যেমন কার্ল মার্কস, রুশো আরো অনেকেই আছেন যাদের লেখনিকে প্রেরণা করে এগিয়েছে তাঁর দেশ, জাতি এই পৃথিবী।

সেই অভাবটা আমাদের দেশে এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। যুগের থেকে আমাদেরকে পিছিয়ে ফেলা হয়েছে। যদি সেই বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক-প্রভাষক, নাট্যকাররা বেঁচে থাকতেন, তাহলে তাঁদের স্বচোক্ষে দেখা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য, ঘটনা, ইতিহাস আমরা তাঁদের লেখনিতে পেতাম। যেমন জাহানারা ইমাম এর “মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি” আমাদের জন্য এক জীবন্ত সত্য ইতিহাস।

আজ দুঃখের সাথে বলতে হয়, কিছু বছর আগের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। যদি ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে থাকতেন, তাঁদের কাছে অবশ্যই আমরা অনেক প্রতিষ্ঠিত তথ্য পেতাম।

তাই ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল, আমাদের বাঙালি জাতির জন্য, বাংলাদেশের উন্নতির জন্য এক মহা বিপর্যয়ের দিন। তোমাদের রক্ত বৃথা যায় নাই। আমরা তোমাদের যোগ্য উত্তরসূরিরা এদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে এভাবে খুঁজে খুঁজে দেশের বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জয় বাংলা!!

 শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস কবে পালিত হয়?

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে কী ঘটেছিল?

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সন্ধ্যা ০৭:৩০ মিনিটে বিবিসির সংবাদে জানা যায় যে, পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ও এদেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় দেশকে মেধাশূন্য করতে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের রায়ের বাজারে নিয়ে হত্যা করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে মূল নীল নকশা কী ছিল?

মূল নীল নকশা ছিল বাংলাদেশকে কয়েক দশক ধরে মেধাশূন্য করে দেওয়া, যাতে বিশ্ব দরবারে মাথা সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে এবং পাকিস্তানিদের গণহত্যার সঠিক বিচার ও তথ্য বিশ্বের কাছে তুলে ধরার মতো কেউ জীবিত না থাকে।

১৪ ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপট কী ছিল?

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আক্রমণে জেলা মুক্ত হচ্ছিল। আমেরিকা যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দিচ্ছিল, রাশিয়া ভেটো দিচ্ছিল। আমেরিকা সপ্তম নৌবহর চট্টগ্রামে পাঠাচ্ছিল, রাশিয়া নবম নৌবহর পাঠানোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল। ঢাকা চারদিক থেকে ঘেরাও ছিল।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার কী হওয়া উচিত?

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো, তাদের রক্ত বৃথা যেতে না দেওয়া। যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকার করা।

তথ্যসূত্র:

Leave a Reply

Scroll to Top