Our Sherpur

সুতানাল দিঘির ভূমিসুতার খোঁজে | রিয়াদ আল ফেরদৌস

সুতানাল দিঘির ভূমিসুতার খোঁজে
রিয়াদ আল ফেরদৌস
রিয়াদ আল ফেরদৌস

দিঘি: কিছু কথা

দিঘি যাপিত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিঘিকে ঘিরে কবিতা, কিচ্ছা-গল্প কিংবা রসবোধ নেহায়েত কম নয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। দিঘি সার্বিক অর্থে একটি মুক্ত জলাশয়। নলকূপ খননের পূর্বে দিঘি সমতল ভূমিতে শুধু এক আঁজলা জলেরই ধারক নয়, বরং সাংসারিক সকল প্রয়োজন মেটানো ছাড়াও সামাজিক ও পারিবারিক অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার অনুঘটক ছিলো। দিঘি খননের সামাজিক ও পারিবারিক কারণ বিস্তর।

অতিরিক্ত মাটি জোগান দেয়ার জন্য বসতভিটা উঁচু করা, নতুন ঘর-ভিটি তৈরি করা, মিঠে পানীয় জলের উৎস, পারিবারিক আমিষের উৎস এবং হাঁস-মুরগি পালনের জন্য একটি দিঘি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় হাট-বাজার নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ ও বসতির উচ্চতাবৃদ্ধি করতে অতিরিক্ত মাটির জোগান কিংবা সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে মাঝারি ও বড় দিঘি খনন হতে পারে। দিঘি আমাদের ব্যক্তি ও জনসমাজে বিস্তর আলাপের জায়গা দখল করে আছে। সুদূর অতীতের দরজায় কান পাতলেই শুনতে পাই সেইসব দিনের কথকতা।

সুদূর অতীতের ভূমিসামন্ত ও রাজা-জমিদারদের একটি সহজাত প্রবৃত্তি ছিলো জীবদ্দশায় স্বমহিমার চিহ্ন অঙ্কন করে জনসমাজে অমরত্ব হাসিল করা। এ প্রেক্ষিতে, নলকূপ এবং যান্ত্রিক জলকল সহজলভ্য হবার পূর্বে রাজা, জমিদার ও ভূমি-সামন্তদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিঘি খনন ছিলো তাঁদের নিয়মিত কায়-কারবার। ফলে তাদের অন্যতম একটি জনহিতকর উদ্যোগ দিঘি খনন করার বহু নজির আছে।

তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দিঘি প্রকৃতিনির্ভর অর্থসংস্থান এবং পরিখা হিসেবে নিরাপত্তার বেষ্টনী হিসেবে এসব বড় দিঘি, সরোবর ও জলাশয় খনন করা। বিশালাকার দিঘি একাধারে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রতীক। পাশাপাশি জনবান্ধব কাজ ও দিঘি ঘিরে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল উত্থান ও পতনের গল্পও আছে।

রাজা আসে, রাজা যায় কিন্তু অমলিন রয়ে যায় তাঁর জনহিতকর কীর্তি। এমন অনেক প্রসিদ্ধ দিঘি আছে। সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি ও কিংবদন্তি জলের তলে পুষে রেখেছে শতাব্দীর কোলাহলের মাঝেও।

সুতানাল দিঘি

সুতানাল দিঘি / বিরহিনী দিঘি / কমলা রানীর দিঘি :

কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজে জলের অফুরন্ত উৎস খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শেরপুর জেলাধীন নালিতাবাড়ী উপজেলার কাঁকরকান্দি ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম মধ্যমকুড়া। উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। এই গ্রামের প্রাচীন অতিকায় বৃহৎ এক মিঠেপানির জলাশয় সুতানাল দিঘি। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই দিঘি নিয়ে নানা জনশ্রুতি আছে, আছে লোকগল্প।

একসময় মধ্যমকুড়া গ্রামে এক রাজবংশী সামন্ত কৌম প্রধান বা গাঁওবুড়া’র শাসন ছিলো। কমলা দেবী সেই কৌম প্রধানের রানী, সুখী তাঁদের দাম্পত্য জীবন। এক রাতে রানী গাঁওবুড়া’র কাছে বিশেষ বর চাইলেন, “আমাকে এমন কিছু দান করুন যা যুগে যুগে মানুষ আমার নাম স্মরণ করবে”। কৌম প্রধান খুব চিন্তা ভাবনা করে রানীকে বললেন, “অবিরাম এক রাত চরকায় সুতা কাটলে যে পরিমাণ জায়গা বেড় দেয়া যাবে, এই পরিধির একটি দিঘি তোমার নামানুসারে খনন করা হবে। সকল মানুষ এই দিঘির জল ব্যবহার ও পান করবে এবং তোমার নাম স্মরণ করবে”। রানীর সম্মতিতে দিঘির খনন কাজ শুরু হয় এবং দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটি বিশাল দিঘি খনন সম্পন্ন হয়।

খননকৃত সুতানাল দিঘি বা কমলা রানী দিঘির এক এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে মানুষ কিংবা পশু-পাখি কিছুই স্পষ্ট দেখা যায়না। এত বড় দিঘি কিন্তু বিধিবাম, দিঘিতে জলের দেখা নেই। রাজা-প্রজা, পাত্র-মিত্র সবাই উদ্বিগ্ন এবং হতাশ। এমন সময় এক রাতে কমলা রানী স্বপ্নযোগে দৈব আদেশ পেলেন। গঙ্গা মা’কে সন্তুষ্ট করতে নরবলি দিলেই কেবল দিঘির বুকে জলসঞ্চার হবে-

গঙ্গাপূজা কর, নর বলি দিয়া।
তবেই উঠিবে দীঘি পানিতে ভরিয়া।।

কিন্তু রানী নরবলির মত নিষ্ঠুর কাজ করতে নারাজ। তিনি ভিন্ন আচারে গঙ্গা মা’কে সন্তুষ্ট করতে চাইলেন। গঙ্গা পূজার মণ্ডপ স্থাপন করা হলো শুকনো দিঘির ঠিক মাঝখানে। দিঘির মাঝে পূজোর যজ্ঞ, জয়ঢাকের দ্রিম দ্রিম আওয়াজে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠলো। হঠাৎ পুকুরের তলায় বজ্রপাতের আওয়াজ করে প্রচণ্ড বেগে জলসঞ্চার হতে দেখা গেল। পূজা আচারের সকল মানুষজন হুড়মুড় করে দিঘির পাড়ে উঠে আসতে লাগলো। কিন্তু কমলা রানী দিঘির মাঝেই রয়ে গেলেন। কোনো এক অজানা কারণে রানী উঠতে পারলেন না।

দিঘির মধ্যে পূজামণ্ডপসহ রানী কমলার সলিল সমাধি রচিত হলো। সেই থেকে এই দিঘি কমলা রানীর দিঘি নামে মানুষের মনে নামাঙ্কিত হয়ে গেল। অবশ্য সুতা কাটার গল্পটিও তো জনশ্রুতি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো তাই সুতানাল দিঘি নামটিও পাকাপোক্তভাবে রয়ে গেল।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী। এখানে আদিবাসী জনজাতির জীবনযাপনের ধরণ, এর অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কিংবদন্তিতুল্য অগণিত লোকগল্প। কালের পরিক্রমায় তা যেন আরও রসালো হয় ও মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। কোচ, ডালু ও হাজংদের বাস্তুনির্ভর প্রকৃতিপূজা এসব লোকগল্পকে আরও জনপ্রিয় করেছে কালক্রমে।

চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এই সুতানাল দিঘির পাড়ে চরক পূজার মেলার পসরা বসতো। জাতপাত, বর্ণ ও গ্রোত্র নির্বিশেষে শত ফুলে রঙিন একটি কৌমবদ্ধ সমাজের বাতাবরণ ছিলো সুতানাল দিঘি সংলগ্ন গ্রামগুলোতে। মূলত সনাতন ধর্মভাবের ডালু, হদি ও হাজংদের এই মেলা কবে গোড়াপত্তন ও শেষ হাট কবে হয়েছিল তা সুতানাল দিঘির জলই কেবল জানে। শালমারার পার্শ্ববর্তী বরুয়াজানী গ্রামের প্রাগ্রসর চিন্তক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান তালুকদার শৈশব স্মৃতিচারণে লিখেছেন–

চরক পূজার মেলা

“সুতানাল দীঘির পাড় থেকে কাঁকরকান্দি গ্রামের জাহিদ মাষ্টারদের বাড়ীর পেছন পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত চরক পূজার মেলায়। এই বিশাল জনসমুদ্রের মূল আকর্ষণ ছিল একটি ‘চরকগাছ’। পূজায় অনেক কষ্টার্জিত এবং ব্যয়বহুল উপকরণাদি প্রয়োজন হত।

প্রায় ত্রিশ ফুট লম্বা একটি শক্ত কৃত্রিম গাছের উপরে কয়েকটি বাঁশের আঁটি একত্রিত করে বাঁধা একটি রেক। চরক বাঁশের মাঝামাঝি এক অংশে ঝুলানো থাকতো একটি মাটির হাঁড়ি। অন্য অংশে থাকতো সদ্য মৃত একটি নারীমুণ্ড-যা থেকে টপ টপ করে রক্তরস এখনো ঝরছে। মাথার লম্বা চুলের সাথে খুব শক্ত করে চরকের বাঁশের সাথে বেঁধে দেয়া হত যা সকলের দৃষ্টিতে একবার না একবার হলেও গোচর হত। বাঁশের দুই প্রান্তে দুটি রশি ঝুলত আর সেই রশিতে নিজের মত করে পেঁচিয়ে দু’প্রান্তে দুজন জোয়ান ধর্মীয় ধ্বনি উচ্চারণ করে চক্কর খেত।

আকর্ষণ বেড়ে যেত যখন কবুতর নিয়ে চক্কর খেত। কিছু জোয়ান হরিবোল ধ্বনি দিতে থাকত আর রশির উপরে ঝুলন্ত দুই প্রান্তের দুই জোয়ান হাঁটুর নিচে রশি চেপে নিচের দিকে মাথা দিয়ে মুক্ত দুই হাতে কবুতরটিকে হ্যাচকা টানে ছিন্ন করে তাঁর মুখে পুরে সমস্ত রক্তটা পান করে মৃতদেহটা অপেক্ষমান জনতার দিকে ছুঁড়ে মারত। কেউ কেউ একই কায়দায় কদমা বাতাসা জনতার দিকে ছুঁড়ে মারত এবং চারদিক থেকে হুড়মুড় করে বালির উপর থেকে কে কয়টি ধরতে পারে এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হত।”

কুস্তি, হা-ডু-ডু, মোরগ ও যাড়ের লড়াই ছিলো মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাতাসা, বুট- বড়া, জিলাপি, নাড়ু, টেপা পুতুল, মাটির পালকি, কলসি, হাতি, কুলুপ বাঁশি, আর বাঁশি ইত্যাদি সামগ্রী এই চরক পূজার মেলায় পসরা সাজিয়ে বসত।

সময়ের ধর্ম মেনে মৌখিক ভাষ্যে নতুন আরো গল্প ডালপালা মেলে। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে কৌম প্রধান সালাশ নামে এক ভূমিসামন্ত/ কৌম প্রধান শালমারা গ্রামে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। সালাশ হাজং, কোচ কিংবা ডালু হবার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা মহাফেজখানার সি.এস এবং আর.এস ভূমি রেকর্ড খতিয়ান স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় এই গ্রামের আদি বাসিন্দারা ডালু, হাজং এবং কোচ জনজাতির মানুষ ছিলেন। শালমারা গ্রামটিও তার আওতায় ছিলো।

গারো পাহাড় অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের অন্যতম একটি একক ‘কুড়’। শালমারা গ্রামের উত্তরে গারো পাহাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল সালাশের আধিপত্যের আওতায় ছিল। এই অঞ্চলে পাঁচ শতাংশে হয় এক কাঠা এবং ২০ কাঠায় এক কুড়। কোচ, হাজং এবং ডালু জনজাতির আদিবাসীরাই এই গারো পাহাড় লাগোয়া জঙ্গলাকীর্ণ ভূমি প্রথম চাষযোগ্য – বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন। যেসব আদিবাসী কৃষকের বেশি পরিমাণ চাষের জমি ছিলো তাঁদের নামের শেষে কুড়া যুক্ত করে ছোট ছোট তল্লাটের নামকরণ হতো বলে ধারণা করা হয়; যেমন আজকের মানিককুড়া, মধ্যমকুড়া, ছোটকুড়া, নৈয়ারিকুড়া; বাকাকুড়া; লক্ষ্মীকুড়া ইত্যাদি গ্রাম।

বাংলার স্বাধীন সুলতান শামছুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দে সালাশ এর বিরুদ্ধে ফৌজ প্রেরণ করেন। সালাশ এর আঞ্চলিক কেন্দ্র এই শালমারা গ্রামে ছিলো বলে শোনা যায়। সুতানাল দিঘি সেই সময়েই খনন করা হয়েছে বলে জানা যায়।

বিগত শতকেও দিঘির পশ্চিম পাড়ে প্রাচীন ইটের ধ্বংসাবশেষ দেখা মিলত। একটা পরিখার মতো কাজ করত এই সুতানাল দিঘি। দিঘির বিস্তার ৬০ একর বা ১৮০ বিঘা জমি। দিঘির মাঝে একটি জলটুঙ্গি ঘরে কৌম প্রধান সালাশ রাত্রিযাপন করতেন। টলটলে দিঘির স্থির জলে সারারাত প্রহরীরা টহল দিতো। সালাশের শেষ বংশধরের নাম শোনা যায় রানী বিরহিনী

দিঘির বিস্তার ৬০ একর বা ১৮০ বিঘা জমি

শেরপুর এর হিতৈষী জমিদার শ্রী হরচন্দ্র চৌধুরী তাঁর “সেরপুরের ইতিহাস” বইয়ের গ্রাম বিবরণীতে বৃহৎ দিঘি হিসেবে ‘কমলা রানীর দীঘি/ রানী বিরহিনীর দিঘি’র কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৪০ সালের ভূমি জরিপ রেকর্ডে দিঘিটি বিরহিনী রানীর দিঘি নামে খতিয়ানভুক্ত করা হয়।

দেশভাগ-উত্তর সময়ে দিঘিটি পরিত্যক্ত মজা পুকুর হিসেবে পতিত থাকে বছরের পর বছর। শালমারা গ্রামের হাজং ও ডালুরা ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকবদলে, ৬৪’র রায়টে দেশত্যাগ করে আসাম ও মেঘালয়ে পাড়ি জমান। পেছনে ফেলে যান ধানক্ষেত, মাটির গন্ধ, ধানের গোলাঘর, বাস্তুদেবীর থান, দেবোত্তর সম্পত্তি, রানী বিরহিনীর দিঘির পাড়, চরক পূজোর মাঠখোলা আরো কত কি।

সেই বছর বাংলা ১৩৭০ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংক্রান্তি; ইংরেজি ১৯৬৪ সন। রায়টের বছর। চরকের মাঠখোলায় সুতানাল দিঘির পাড়ে শেষ চরক পূজার মেলার ছাউনি পড়েছিল। জয়ঢাকের ডঙ্কা কি কোন উত্তাপ ছড়িয়েছিল সেদিন সুতানাল দিঘির পাড়ে? ছড়িয়েছিল বৈকি।

জনজীবনে ছড়িয়ে পড়ে রায়টের শঙ্কা। হাজং, ডালু ও কোচ জনজাতির ভূমিপুত্ররা সে-বছর দলে দলে বাস্তুভিটা ত্যাগ করে গাট্টি বোচকা মাথায় করে দর্শা খাল পাড়ি দিয়ে দূর গারো পাহাড়ের দিগন্তে হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে। বর্তমানে, চরক পূজার মাঠ গিলে খেয়েছে প্যারাগন নামের আধুনিক কৃষি শিল্পকারখানা। তিন ফসলি ধানের খেত বছর বছর ভরাট করে ভিটে বাড়ি ও দালান তৈরি হচ্ছে।

ইতিহাস বলে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দিঘির পাড় লাগোয়া ভূমিহীন মুসলিম বসতি বাড়তে থাকে। ১৯৭২ সালে প্রথম দিঘিটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি। ১৯৮০ সালে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় দিঘিটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন স্থানীয় সাংসদ ও তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুস সালাম। সংস্কার পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় নগদ অর্থে প্রকল্পটি শেষ করা হয়।

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মাছ চাষের ব্যবস্থা হয় সেসময় থেকেই। দিঘি পাড়ের এবং নিকটবর্তী অঞ্চলের দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষদের নিয়ে ‘সুতানাল দীঘিপাড় ভূমিহীন মজাপুকুর সমবায় সমিতি’ নিবন্ধিত হয় ১৯৮৪ সালে। বর্তমানে সুতানাল দিঘির উপকারভোগী সদস্য সংখ্যা ১১৮। সকল সদস্যই দিঘিপাড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। প্রতি বছর সুতানাল দিঘিতে সৌখিন মাছ শিকারিদের এক মহা মিলনমেলা বসে। বছরে নির্দিষ্ট সময়ে ২০ হাজার টাকা বা তাঁর বেশি মূল্যমানের টিকিটে একটি মাচা বিক্রি করা হয় টানা ৪৮ ঘণ্টা বা ৭২ ঘণ্টা মৎস্য শিকারের জন্য।

সারা দেশে সুতানাল দিঘি মাছ শিকারের জন্য বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসে ক্যাম্প করে মাছ ধরেন এই দিঘিতে। স্থানীয়দের বরাতে জানা যায় বিগত ১৪৩১ বাংলা সনের ভাদ্র মাসে শেষবার ৩০ হাজার টাকা প্রতিটি মাছ ধরার মাচা টিকেট আকারে বিক্রি হয়েছিল।

আধুনিক ফাইবার বরশি কেবল মাছ ধরায় ব্যবহার করা হয় এই শিকার উৎসবে । প্রথমে প্রত্যেক মাচা থেকে আলাদা আলাদা চার করা হয় সুবিধাজনক দূরত্ব বুঝে। বরশির প্রধান টোপ লাড্ডু। এই মোয়া আকৃতির লাড্ডু তৈরির উপাদান হচ্ছে ছাতু, মধু, পাহাড়ি পিঁপড়ার ডিম, চু মদ, সাথে বাহারি সুগন্ধি টোস্ট বিস্কুট বা পাউরুটি ইত্যাদি রসনা। বিশেষত কাতল মাছ শিকারের টোপ এটি।
অন্যান্য বড় ৮/১০ কেজির মাছের জন্যও এটি প্রযোজ্য।

আশেপাশের গ্রামের দক্ষ শিকারিরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মৎস্যপ্রেমিদের আহরণ ফলপ্রসূ করতে ভাড়ায় শ্রম দিয়ে থাকেন।

এছাড়াও মাছ ধরার টোপ বিক্রি একটি সাময়িক লাভজনক ব্যবসা জমে ওঠে দীঘির পাড়ে। মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে দিঘিপাড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। পণ্য বিক্রি ও মাছ শিকারীদের সমাগমে এলাকার অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হয়। হরেক মাল, খেলার সামগ্রী, ভ্রাম্যমান খাবার, পিঁপড়ার ডিম, মধু, ছাতুসহ মাছ ধরার সাথে সম্পর্কিত হরেক উপাদান বিক্রি হয় দিঘিপাড়ে।

ধারণা করা হয়, দিনাজপুরের রামসাগরের পর সুতানাল দিঘি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠেপানির জলাশয়। এর অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য বাদ দিয়ে শুধু মৎস্যচাষ কেন্দ্র হিসেবে একে যাপন ধরা কাম্য নয়। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র:

  • চৌধুরী ১৮৭২।। শ্রী হরচন্দ্র চৌধুরী, সেরপুরের বিবরণ, বিডন স্ট্রিট ৩২/১ নং ভবন স্কুল বুক প্রেস, কলকাতা।
  • আব্দুল্লাহ ২০২৫।। মাহমুদ আব্দুল্লাহ সম্পাদিত, ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলের কিংবদন্তি, হালুয়াঘাট দর্পণ পরিষদ, হালুয়াঘাট, ময়মনসিংহ।
  • সালাম ২০০৬।। অধ্যাপক আব্দুস সালাম, নালিতাবাড়ীর মাটি ও মানুষ এবং আমি, নালিতাবাড়ী, শেরপুর, পৃ- ৩৩১-৩২।
  • রহমান ২০০২।। আবদুর রহমান, চরক পূজার মেলা, মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল সম্পাদিত, মাসিক সংলাপ, ১ বৈশাখ, ১৪০৯ বাংলা, ১৪ এপ্রিল ২০০২, নালিতাবাড়ী, শেরপুর।
  • কথোপকথন ; বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান তালুকদার। নালিতাবাড়ী শেরপুর।

রিয়াদ আল ফেরদৌস: গবেষক; সম্পাদক, সাহিত্য পত্রিকা: বালুচর

Leave a Reply

Scroll to Top