
লেংগুরার ভূমিপুত্র কমরেড ললিত সরকার
ময়মনসিংহ মহকুমার উত্তরপর্বে ৭০ মাইল দীর্ঘ বা ৭৫০ বর্গমাইল জুড়ে গণ আন্দোলনের এক টুকরো গ্রাম লেংগুরা। গারো পাহাড়ের এই উপত্যকা ও সমতলে ১৯৪৫ সাল থেকে ৪৭ সাল অবধি টঙ্ক আন্দোলন গণ বিপ্লবের রূপ নিয়েছিল। ১৯৪৯-৫০ সাল নাগাদ সশস্ত্র বিপ্লবে পরিণত হয় টঙ্ক আন্দোলন। সেই সময়কার লেংগুরার অবস্থাসম্পন্ন কৃষক পরিবারের সন্তান ললিত সরকার। বংশ পরম্পরায় তাঁরা হাজং ও পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রভাবশালী– নেতৃত্বস্থানীয়ও বটে। তাঁর বসতভিটা, ধানি-খেত, গোয়াল, গোলাঘর- সমস্ত সংসার গনেশ্বরী নদীর তটে।

র্যাডক্লিফ লাইন টানার কয়েক শতাব্দী পূর্ব থেকেই এই পাহাড়ি জনপদে ললিত সরকার, কণা বর্মণ ও পরেশের পূর্বপুরুষদের তৈরি সমাজবিধি ও কাঠামো প্রতাপের সঙ্গেই বহাল ছিল। তাঁরাই পাথুরে এই পাহাড়ি ভূমিকে বাঘ ভাল্লুক আর বুনো সজারু শুকরের সঙ্গে লড়াই করে চাষযোগ্য ও বাসযোগ্য করে তুলেছিলো। সমাজ ও রাজনীতি বিকাশের এক কালপর্বে গনেশ্বরী নদীর তটে হাটও গড়ে উঠেছিলো কণা হাজংয়ের মাঠ খোলানে। তবে ওই হাটের দক্ষিণপাশে সুসং জমিদারের জমিতেও তখন হাট বসতো।
জমিদারের টঙ্ক ধান (ধান কড়ারি খাজনা) ও খাজনা আহরণ এবং নায়েব, গোমস্তা, দেওয়ান, মোহরার, আমিন, পেশকার, তহশিলদার, পেয়াদা, লাঠিয়ালদের নিয়ন্ত্রণের জন্য দক্ষিণের বর্ধিত নতুন হাট বা জমিদারের হাট বসানো হয়। মোটাদাগে হিসাব এই যে, লেংগুরা হাটের দুই তৃতীয়াংশ কণা বর্মন এর খোলানে এবং এক তৃতীয়াংশ জমিদারের হিস্যায় তাঁর পত্তন করা হাট। জমিদারের হাটের মধ্যে একটি কাচারিতে তাঁর কর্মচারীরা ভাগচাষী ও প্রান্তিক কৃষকদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করত। তবে কৃষকসভার প্রভাব বেশি থাকায় হাজং-কৃষক মালিকানাধীন হাটে খাজনা তোলা সম্ভবপর ছিল না। মুক্ত ওই হাট ছিল পাহাড়ি গারো হাজং, আর সমতলের দূর দূরান্তের কৃষকের পণ্য বিনিময়ের পছন্দের জায়গা।
লেংগুরা হাট বর্তমানে নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার ৬নং লেংগুরা ইউনিয়নে অবস্থিত। এই প্রবন্ধ লেখার তথ্যউপাত্ত সংগ্রহের জন্য একসময় সরেজমিনে ওই হাটে যাই। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা লেংগুরা গ্রামের নামেই হাট। হাট থেকে কামাক্ষ্যা মাতার মন্দির পেরিয়ে কিছুদূর উত্তর-পশ্চিমে দেখা মিলল নবনির্মিত এক কালী মন্দির। হাজংরা জাগ্রত দেবী কামাক্ষ্যা ও কালী মাতার পূজারী। এদের মাঝে শাক্ত এবং বৈষ্ণব দুটি মতবাদের প্রাধান্য দেখা যায়। লেংগুরা হাটের উত্তরে ললিত সরকারের বাস্তুভিটার আঙিনায় পাহাড়ি টিলার উপর কামাক্ষ্যা মন্দির স্থাপিত হয় বাংলা ১২৯১ সনে। লেংগুরার সকল হাজংরা সুদূর অতীত থেকেই এখানে বাস্তুপূজায় অংশ নিত। এখনো একাধিক কালি মন্দির আশেপাশে দেখা মেলে।
মন্দির এর পশ্চিম কোণে টিলার উপর এক ঘর হাজং পরিবার। সেখানে কণা হাজং এর মেয়ে উত্তরা হাজং এর বাস। তাঁর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পারিবারিক বিপর্যয়ের করুণ কাহিনী জানা গেল। উত্তরার মা কণা হাজং একাত্তরে শরণার্থী অবস্থায় বার্ধক্যজনিত কারণে নব্বই উর্ধ্ব বয়সে সীমান্তের ওপারে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে কণার পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক সম্পত্তি বেদখল আর হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি শুরু হয়। ফলে কণা হাজংয়ের নি:স্ব বংশধরদের দিনাতিপাত হয় খেতের ফসল আর পাহাড়ের শাক-সবজি কুড়িয়ে। অথচ মাত্র অর্ধশতাব্দী আগে লেংগুরা হাটের দুই তৃতীয়াংশ মালিকানা তাঁদেরই ছিল। (১)
লেংগুরা বাংলাদেশের উত্তরপুবের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তাই লেংগুরা হাট নিয়ে আলোচনায় আমি এর রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিত ধরেই অগ্রসর হবো। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় অনুশীলন, যুগান্তর, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ইত্যাদি বিপ্লবী সশস্ত্র সংগঠন উত্তর ময়মনসিংহে বেশ সক্রিয় ছিল। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অনুশীলন, যুগান্তর, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স এর সমন্বয়ে আন্দোলনের শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল গারো পাহাড়ের আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। সেইসব দিনে কৃষক আন্দোলনের উত্তাল হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে লেংগুরার চারদিকে।
আদিবাসী অধ্যুষিত ওই পাহাড়ি অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে তখন নানকার, ভাওয়ালি, বেগার, টঙ্ক, মহাজনি প্রথার বেশ প্রতাপ ছিল। ধীরে ধীরে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-আন্দোলন সংগঠিত করতে কৃষক সভার বিস্তার বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়েও তাঁদের ভূমিকা অগ্রগণ্য ছিল। আর একাত্তরের বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা তো সুবিদিত। অন্যায় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সব কালেই সোচ্চার ছিল।
হাজং নেতা ললিত সরকার, বিপিন গুণ, কাঙ্গাল, পরেশ হাজং প্রমুখ শিক্ষিত যুবক কৃষক সভার কার্যক্রম বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটিশ শাসন বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় লেংগুরা হাটে কংগ্রেসি স্বেচ্ছাসেবকদের বক্তৃতা শুনে ওই এলাকার অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে। ‘স্বরাজ চাই’ ‘স্বেচ্ছাসেবক’ ইত্যাদি মার্কাওয়ালা টুপি তখন খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তরুণদের মাঝে। হাটে ঘুরে ঘুরে আদিবাসী কৃষকরা গাইতো-
গান্ধীরাজা আইল দেশে
লড়াই করে সিয়ার দাশে
পরিও না রেশমী চুরি
আর নম্বরি শারী
হারে রে…রে…হারে রেরে…।
১৯২০-২১ সালে খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলে ছাত্রাবস্থায় মহেশ, নবীন, বেলীকান্ত, মণিকান্ত, গজেন্দ্র, ললিত, নয়ান সহ হাজং যুবারা স্কুল বয়কট করেছিল। এরপর কংগ্রেসের রাজনীতি করে জেল খেটে প্রথম মুক্তির লড়াই শুরু করেন ললিত সরকার। পরবর্তী জীবনে ললিত সরকার ময়মনসিংহের ত্যাগী বিপ্লবী ক্ষিতিশ চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে আসেন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে সার্বক্ষণিক কর্মী হয়ে কাজ করেন।
ময়মনসিংহ শহরে ক্ষিতিশ চক্রবর্তী ও বীণা চক্রবর্তী পার্টির কাজে দিনরাত ব্যস্ত থাকার কারণে তাঁদের শিশুপুত্র দিলীপ চক্রবর্তীকে ললিত সরকার পিতৃস্নেহের বশে লেংগুরা নিয়ে আসেন একটা সময়। ললিত হাজংয়ের স্ত্রী মানিক হাজং শিশু দিলীপ চক্রবর্তীকে বুকের দুধও পান করিয়েছিলেন।
১৯৪৩ সালের লেনিন ডে উপলক্ষে কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য সভায় পি.সি যোশীর আহ্বানে ললিত সরকার ও তাঁর পরিবার সমস্ত সম্পত্তি কমিউনিস্ট পার্টির নিকট উৎসর্গ করেছিলেন। এই ঘটনা হাজং জনগোষ্ঠীর মাঝে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। হাজং জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার এসে কৃষক সভার পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। (৬)
মূলত টঙ্ক ও লেভী ধান প্রথার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী ললিত সরকারের ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। যাহোক, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার সেই গণআন্দোলনের গুরুত্ব অনুধাবন করে আন্দোলন দমাতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্যাস্টিন প্রশাসন নগ্ন দমনপীড়ন চালাতে থাকে। হাজং ও টঙ্ক চাষিদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়, নারীদের সম্ভ্রমহানি সহ সকল মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চলে।
১৯৪৫ সালে নেত্রকোণার নাগরার মাঠেই পাঁচ থেকে নয় এপ্রিল বসেছিল সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনের নবম অধিবেশন। শীর্ষ ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি এসেছিলেন পি সি যোশী, কমরেড মুজাফফর আহমদ, গোপাল হালদার, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, খোকা রায়, সোমনাথ লাহিড়ী প্রমুখ। সেই সম্মেলনের শীর্ষ প্রয়োগকর্তা মণি সিংহ। লক্ষাধিক আদিবাসী হাজং নারী পুরুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এর আগে কেউ স্বচক্ষে দেখেনি।
ললিত সরকার মানিক বন্দোপাধ্যায়কে কাছে পেয়ে বললেন “ময় কমরেড আপনার পদ্মা নদীর মাঝি পড়ছু। আপনি পদ্মার জেলেদের মত মুদের গারো পাহাড়ের দুখি ভাগ্যহত মানুষের কথা লিখবেন নয়?”
১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে একদিন হঠাৎ লেংগুরা হাটে এসে উপস্থিত হলেন কমরেড মণি সিংহ।(১) ততোদিনে জেলফেরত মণি সিংহ পূর্ববঙ্গের ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের মাঝে নায়ক হয়ে উঠেছেন। তাঁর মাতৃকুল সুসঙ্গ জমিদার পরিবারের প্রচুর টঙ্ক জমি ছিল ওই অঞ্চলে। পাহাড়ি আদিবাসী কৃষকদের দুরাবস্থা দেখে তিনি তাঁর মা’র অধীনস্থ জমিগুলো টঙ্ক মুক্ত করে দেন। (১) এরপর মণি সিংহ টঙ্কবিরোধী তীব্র আন্দোলনে সামিল হয়ে যান।
ঐতিহাসিক সেই আন্দোলনে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন বয়সে তাঁর চেয়ে ছয় বছরের ছোট ললিত সরকার, জলধর পাল, প্রমথ গুপ্ত, বিপিন গুণ, রায় মোহন, অশ্বমণি হাজং, ভদ্রমণি হাজং, কলাবতী হাজং, রথিকান্ত হাজং, শ্রীবৎস, কোকিলা, রহেলা, লতিকা নকরেক, রনিলা বনোয়ারী, সতীশ ঘাঘরা, রেনুকা মৃ সহ সীমান্তের নিপীড়িত আদিবাসীরা। তাঁদের নিয়ে মণি সিংহ একটি সক্রিয় রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলেন।
লেংগুরা হাটে চলত এইসব বিপ্লবীদের প্রকাশ্য ও গোপন সভা, মিছিল ও গণসংযোগ। তখন হাটের উপর দিয়েই পৌছাতে হতো ললিত সরকারের বাড়িতে। জানা যায়, লেংগুরার গুরুদয়াল অধিকারী (হাজং পুরোহিত দেউসি) মৃত্যুর আগে অন্তিম ইচ্ছেমত সকল ভূসম্পত্তি মণি সিংহের হাতে পার্টি তহবিলে দান করে যান।(১)
অবিভক্ত ভারতের তখনকার দিনে আসাম-মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের গ্রামগুলো থেকে গারো নারী পুরুষরা নানা রকম জিনিসপত্র বিক্রি করতে আসত লেংগুরা হাটে, ফিরে যাবার সময় তাঁদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনে নিয়ে যেত। পুরাতন বাজারের সাথেই উত্তর দিকে আরেকটি নতুন হাট স্থাপিত হচ্ছিল কেননা পুরাতন হাটটি ভেঙে গিয়েছিল।
সারা ভারত কৃষক সম্মেলনের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে স্থানীয় ভলান্টিয়াররা হাটের ব্যাপারে সময় দিতে পারেনি বিধায় এরূপ অবস্থা দাড়িয়েছিল। মণি সিংহ উদ্যোগ নিলেন। মণি সিংহের নির্দেশে আবার পুরাতন হাট সরগরম হয়ে উঠলো। ভলান্টিয়াররা পাহাড়ি গারোদের এই হাটে নিয়ে এল, বেচাকেনার একটা ধুম পড়ে গেল। নতুন হাটে তখন মানুষ সমাগম একদম কমে গেল।
কিন্তু সাতচল্লিশে দেশভাগের ফলে সৃষ্ট সীমান্ত বিভাজনরেখা সীমান্তবর্তী হাজং জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনকে বিষন্ন করে তোলে। সাম্প্রদায়িকতা মাথাচারা দেয়। নবসৃষ্ট পাকিস্তানে অমুসলিম হাজং অধ্যুষিত লেংগুরা শাসকগোষ্ঠী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ক্ষমতাবানদের শোষণ-দখলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। যে অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনা নিয়ে বিপ্লবী ললিত হাজংরা একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষে আমৃত্যু কাজ করেছেন তা ক্রমান্বয়ে ভীষণ মার খেতে থাকে। দখল ও অত্যাচারের কবলে পড়ে শত শত হাজং পরিবার দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

টঙ্ক আন্দোলনে রক্তাক্ত লেংগুরা হাট
টঙ্ক প্রথার ভয়াবহতা লেংগুরা মৌজায় ছিল চরম। ১৯৩৭-৪০ সালের মধ্যে টঙ্ক আন্দোলনের প্রথম ঢেউ শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে মুসলিম লীগ ক্ষমতায় এলে পাহাড়ি অঞ্চলে শুরু হয় টঙ্ক আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে টঙ্ক আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায় ধরা যায়। ‘টল্ক নাই, আধিও নাই’, ‘লাঙ্গল যার জমি তার’, ‘জান দেব-তবু ধান দেবোনা’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, মণি সিং দিছে ডাক’- এসব স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠেছিল পাহাড়ি অরণ্যঘেরা আদিবাসী গ্রামগুলো।
কমিউনিস্ট পার্টি; আদিবাসী হাজং, ডালু জনগোষ্ঠীর বাছাইকরা কর্মীদের নিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে গড়ে তুলেছিলো স্বেচ্ছাসেবক গেরিলা বাহিনী।
প্রমথ গুপ্ত সে সময়কার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে লিখেছেন:
এই অঞ্চলের দুর্ভেদ্য পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে পরিখা খনন করিয়া অম্বলুকা, দাম্বুক, বেড়াখালি, পানিহাটা, রাঙটিয়া, চাঁন্দুভুই প্রভৃতি স্থানে নয়টি গেরিলা ক্যাম্প স্থাপিত হইল। সেই সঙ্গে নির্মিত হইল সুরক্ষিত স্থানে অস্ত্র তৈরির আটটি কারখানা। এই সব কারখানায় গদা বন্দুক, দেশি পিস্তল এবং সাড়ে ছয় ফুট মাপের বড় বড় কামান তৈরি হইত। প্রতিটি ক্যাম্পে দেড়’শ থেকে দুই’শ ব্যক্তির বসবাস সম্ভব ছিল। তাছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের চিকিৎসার জন্য ছিলেন ডাক্তার অমিয় দাসগুপ্তের নেতৃত্বে দু’তিনজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক।(২)
১৯৪৯ থেকে শুরু করে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত নালিতাবাড়ী থেকে হালুয়াঘাট ও নেত্রকোণার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, লেংগুরা ছিলো বর্গাচাষি কৃষক ও আদিবাসীদের সশস্ত্র আন্দোলনের এক দুর্ভেদ্য অগ্নিগর্ভ। কমরেড মণি সিংহ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন-
প্রতিদিন পুলিশের সাথে কোন না কোন জায়গায় সংঘর্ষ হতো। সমগ্র এলাকা একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। টঙ্ক, লেভি, মহাজনি ঋণ সবই বন্ধ হয়ে গেল। সশস্ত্র পুলিশও ভীত হয়ে পড়ল। কখন কোথা থেকে যে চোরাগুপ্তা গুলি আসে বা বোমা ফাটে কিছুই ঠিক নেই। সরকারও মরিয়া হয়ে গ্রামবাসীদের দমাবার জন্য প্রচণ্ড দমননীতি চালিয়ে যেতে লাগল।(১)
এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালে লেংগুরা হাটে টঙ্ক চাষিদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ফুঁসে উঠেছিল। সে বছর ৮ জানুয়ারি কলমাকান্দার চৈতন্যনগরের নিলচাঁদ হাজং এর ২০ মন টঙ্ক ধান আটক করলে গ্রামবাসী বাঁধা দিলো এবং নিলচাঁদ এর গোলায় তুলে দিলো। ধান রক্ষার এই সাফল্যের খবর দ্রুত হাটে-গঞ্জে চাউর হয়ে গেল। সমিতির পক্ষে হাটে বাজারে একশো প্রচারকারী আওয়াজ তুলল

‘টঙ্ক নাই, আধিও নাই,’ ‘লাঙ্গল যার জমি তার,’ ‘জান দেব তবু ধান দেবোনা, সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’। মণি সিং, ললিত দিল ডাক, টঙ্ক টঙ্ক টঙ্ক নাই, রাজা জমিদারের ধান্য নাই।
এই উদ্দীপনা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল। ১৫ জানুয়ারি আবার বটতলায় ২৫ মণ টঙ্ক ধান আটক হলে পুলিশের সঙ্গে চাষিদের রক্তাক্ত সংঘর্ষ বাঁধে এবং দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। পরদিন লেংগুরা কৃষক সমিতির পক্ষ থেকে চল্লিশজনের একটি কৃষক দল হাতিয়ার ও প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সহ বটতলায় পৌঁছে প্রথমে পড়ে থাকা ধান দখল করে এবং আহত চাষিদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
এই ঘটনার পরেই ২৩ জানুয়ারি লেংগুরার কৃষক ও টঙ্ক চাষিরা নব নির্মিত সুসং জমিদারের কোর্ট আব ওয়ার্ডসের চৈতন্যনগরের কাচারিবাড়ির দখল নেয়। পরদিন সকাল ৭ টায় কৃষক সমাবেশ হয় এবং গণ আদালতে একজন তহসিলদার ও পাঁচ জন বন্দি পেয়াদার বিচার করা হয়। কাচারির দলিল দস্তাবেজ ও অন্যান্য খাজনার কাগজপত্র পুড়িয়ে ছাই করা হল। গণ আদালতে টঙ্ক ও খাজনা রহিত করা হল, কেউ যেন টঙ্ক ধান না দেয়। কোর্ট আব ওয়ার্ডসের ম্যানেজার ও পুলিশ হাতি ও জিপ সমেত আক্রমণ চালিয়েও জনতার বূহ্য ভেদ করতে পারল না। এভাবেই কলমাকান্দার ৬ নং লেংগুরা ইউনিয়ন বিদ্রোহী টঙ্ক চাষিদের দখলে চলে এল।
ওই রক্তস্নাত ঘটনার সাত দশক পেরিয়ে গেছে। আদিবাসী হাজং ও তাঁদের সেই হাটের সুলুকসন্ধানে সম্প্রতি হাজির হলাম লেংগুরায়। হাটের পাশাপাশি ৬ নং লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বিপরীত পাশে স্কুল। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উত্তর সীমানার পাঁচিল ঘেঁষে ভেন্না গাছের ঝোপ-জঙ্গল চোখে পড়ল। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যে জানা গেল, ভবন তৈরির জন্য খননের সময় এখানে মিলেছে মানুষের হাড়গোড়, মাথার খুলি। সেদিনের গণহত্যার পরে টঙ্ক শহীদদের মৃতদেহ এখানেই পুঁতে ফেলা হয়েছিলো।(৪)
টঙ্ক প্রথা বাতিল হয়েছে, জমিদারি উচ্ছেদ হয়েছে, ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানী শোষণ মুক্ত হয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলও হয়েছে অনেক। বীর হাজং চাষিদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। অথচ এর পরে স্বাধীন দেশে তাঁদের আত্মত্যাগের রক্তের উপর আজ দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন হাটবাজার, পোস্ট অফিস। বিগত শাসকরা স্বীকৃতি ও স্মৃতিরক্ষা কোনোটিই করেনি বিগত সাত দশকে।
টঙ্ক, তেভাগার লড়াই কি ও কেন তা সংঘঠিত হয়েছিল? কেন তা ন্যায্য আন্দোলন ছিল, কারা লড়াই করেছে ও জীবন দিয়েছে। বিপরীতে জুলুমকারী ও হত্যাকারী কারা- আজকের প্রজন্ম সেই ইতিহাস না জানলে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ললিত হাজং এর পূর্বসূরীরা শতাব্দীজুড়ে লড়াই করেছেন, রক্ত দিয়েছেন। কখনো ঔপনিবেশিক জুলুমের বিরুদ্ধে, কখনো সমতলের জমিদার, সমাজপতি ও দখলদারদের বিরুদ্ধে। হাতিধরার দাসত্বের বিরুদ্ধে মনা সর্দার যেমন জীবন দিয়েছেন, তেমনি ললিত হাজংরা ফসলের ন্যায্য হিস্যার বঞ্চনা ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তাঁদের লড়াই ছিল জাতি হিসেবে তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ধারাবাহিক জুলুমের অবসান ও ন্যায্য মানবিক অধিকারের স্বীকৃতির। কিন্তু প্রাপ্তির খাতা শূন্যই থেকেছে। উপরন্তু ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে শেষমেষ উদ্বাস্তু জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন হাজংদের অনেকে। ললিত হাজংয়ের মত ব্যক্তিত্বকেও রাষ্ট্রহীন উদ্বাস্তু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে আসামে। পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার ‘বাংলা আমার বাংলাদেশ’ কবিতাটি উৎসর্গ করেছেন বীর ললিত সরকারকে।
উনিশশো সাতচল্লিশ থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত উত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে আদিবাসীদের দেশত্যাগ অব্যাহত ছিল। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ও দেশত্যাগের নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করলেই জানা যাবে তাঁদের বঞ্চনার করুণ কাহিনীগুলো। উল্লেখ্য, লেংগুরা হাটের গণহত্যার পরে পাহাড়ি সীমান্ত অঞ্চলে ধারাবাহিক সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়। হলদিবাড়ি ও রানিপুরের সশস্ত্র আন্দোলনে গ্রেফতার হন রবি নিয়োগী ও জলধর পাল। টঙ্ক আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে জেলিমেন্ট বোমা বানানোর সময় শহীদ হন কমরেড শচী রায়। (৬)
লেংগুরা অঞ্চলে গাই-গরু, মোষ, হালের বলদ, খেত খামার কিংবা নদী ও খাল-বিলের অঢেল ভাগনা, বোয়াল, বাউস মাছের ভাণ্ডার ছিল টইটুম্বুর। লেংগুরা হাটকে বেষ্টন করে আছে চপলা পাহাড়ি নদী গণেশ্বরী। গণেশ্বরী এক জামানার দুরন্ত তেজস্বী নদী; সম্পদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ তার হৃদয়। গণেশ্বরীর ভাগনা, বোয়াল, কাল-বাউস, বইট্টা, চাপিলার প্রাচুর্যের ইতিহাস কিংবদন্তিতুল্য। মেঘালয়ের সুউচ্চ গিরিখাত বেয়ে অসংখ্য ছোট বড় ছড়া ঝর্ণার পানি দুরন্ত বেগে প্রবাহিত করে গনেশ্বরী নদী অধুনা সীমান্তরেখা ভেদ করে লেংগুরা হাটের পাশ দিয়ে ভাটিতে চলে গেছে। নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে উত্তর থেকে দক্ষিণে হাটের বিস্তৃতি। শুরু থেকেই শুক্রবার ও সোমবার বড় হাট বসে। নানান রঙের, ঢঙের দ্রব্য ও মানুষের আনাগোনা লেনাদেনা চলে। চলে হরেক কায়কারবার। (৪)

মানুষ আসে পুবের পাঁচগাঁও, মহিষখোলা, দক্ষিণের নেত্রকোণা, শামগঞ্জ, কলমাকান্দা পেরিয়ে গারোরা আসে। সূদূর অতীত থেকেই এমনটি হচ্ছে। পাহাড়ের ওপারে সবজি ও পশ্চিমের দুর্গাপুর সোমেশ্বরীর ওপরের ধোবাউড়া থেকে। উত্তর গারো পাহাড়ের আবাদ নেই, পাথুরে জায়গা। পাহাড় নদী পেরিয়ে শুকনা ঝরা পাতা মাড়িয়ে মর্মর শব্দে গারো হাজংরা নিয়মিত সমতলের হাটে বাজার করতে আসত। এখনো আসে এই লেংগুরা হাটে। নদীর ধারেই ছিল পাহাড়ের ঢালে আমলকী, শিমুলের প্রকাণ্ড গাছ। এর ছায়াতলে আদিবাসী হাটুরেরা দল বেধে অবস্থান নিতো হাটের আগের দিন। রাত্রিযাপন শেষে হাটবারে প্রয়োজনীয় দ্রব্য, মাছ, সবজি নিয়ে ফিরে যেত নদীর পথ ধরে।
কৃষক আন্দোলনের অন্যতম পাদপীঠ লেংগুরা হাটকে কেন্দ্র করে হাটুরেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা ছিল। আদিবাসী লোক পরিবেশনা, সাথে মন্দিরা, ডুগডুগি, চইট্যা, স্বরাজ, ঢোলক, বংশী, মহিষের সিঙা, ইত্যাদি বাজিয়ে একসময় হাটের দিন গণসঙ্গীত ও আন্দোলনের জন্য কৃষকদের সমবেত করতে ডাক দেওয়া হত। কৃষক কষাণীর হাতে তীর, ধনুক, বল্লম, ভোজালি এসব ছিল প্রচলিত। হাজং কৃষকরা এসব জিনিস নিজগৃহের কামারশালায় তৈরি করত।
হাজং পরিবারগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল সুদূর অতীত থেকেই। বিগত শতকের আটের দশক অবধি লেংগুরা হাটে বড় বড় কোশা নৌকা বোঝাই পণ্য আমদানি-রফতানি হত। হাট লাগোয়া নৌকা ঘাট। নদীতে তখনও কোন সেতু হয়নি। একমাত্র ডিঙি নৌকা ও বাঁশ কলাগাছের ভেলাতেই পারাপারের ভরসা। বাণিজ্য করতে সওদাগর আসত কলমাকান্দা, বাসাউড়া, মনতলা, বিয়ারপাড়, চক্রমপুর থেকে। হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা বোঝাই নৌকা আসতো প্রচুর। নদী ছিলো বেশ গভীর।
ছাতির চর থেকে আসতো বিখ্যাত মিষ্টি আলু যা এখন খুব একটা পওয়া যায় না। উত্তর থেকে গারোরা কমলালেবু, বাঙ্গি, পাহাড়ি সুপারি নিয়ে আসতো। ক্লান্ত হাটুরেদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারণের খোরাক ভাটি অঞ্চলের ঐতিহ্য মৈষের দুধের দৈ, বিন্নি ধানের খৈ, শাইল ধানের চিড়া আর সবরি কলা। সেই অকৃত্রিম স্বাদ, ঘ্রাণ আজ বিস্মৃত হতে চলছে।
লেংগুরার ঐতিহ্যবাহী ধান ‘আসকল’ সবচেয়ে বেশি আবাদ হত একসময়। এই ধান বাইন অর্থাৎ বীজ ছিটিয়ে রোপন করা হতো। কেননা বীজতলা তৈরি ও জমিতে লাগানোর জন্য কৃষি শ্রমিক পাওয়া যেত না সেসময়। বাওয়া মৌসুমে লতি শাইল, চিক্কন মালঞ্চি, হাতিবান্দা (কালো ধান), বিরই, চিনিশাইল ইত্যাদি চাষ করা হতো। আউস ধানের মধ্যে চম্পাকলি, খুরমা, ক্ষুদ বাদাম বিখ্যাত ছিল। প্রবাদ ছিল-
দৈ, চিড়া, বিচি ভাত
খার পানি লেবা হাগ
কাছিম গোশত
হিদল মাছ
গুষ্ঠি বাড়ির বুকনি ভাত।
ঐতিহ্যবাহী মাটির সানকি, পাতিল, বাঁশের তৈরি নাকইর, ঘুটনি, নারকেলের খোলে তৈরি ডালের উরন এখন বিস্মৃত উপাদান। চিনামাটি আর ক্রোকারিজ বাজার এখন রাজধানী থেকে এই হাট অবধি রমরমা ব্যবসা। ধান মলনের জন্য বলদ আজকাল হাটে উঠে না, চাষের বলদের বিক্রিবাট্টা নাই বললেই চলে। এখন আধুনিক বম মেশিনে নিমিষেই ধান মাড়াই করা হয়। ধান কাটার আধুনিক মেশিনও আজকাল সহজলভ্য।
পূজা পার্বণ সহ সংক্রান্তির উৎসবকে কেন্দ্র করে পিঠা-পুলি, পারিবারিক মিলনমেলা আর হাট থেকে ধামা ভরে আনা খৈ, ঘটের দৈ, গুড়, বাতাসা নারিকেল, তাল কেনার সেই আমেজ নেই। হাল আমলে এই হাটেও গড়ে উঠেছে ফাস্টফুড, নদীর তীরে ফুচকা, সিঙারার দোকান। পারিবারিক রীতির বার্ষিক নাইওর কেউ করে না আজকাল।
একসময় লেংগুরা হাটে আশেপাশের আদিবাসী পাড়া থেকে তাঁতের লুঙ্গি, গামছা, থামি, পাথিন, লেফেন আসতো; এখন এর বাজার পড়তি। একসময় দুর্গাপুরের ঠাকুর ব্যাপারি হাজং ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি বাড়ি তাঁতের সুতা বিলিবণ্টন করে আসত। এখন আদিবাসী তাঁত প্রায় বিলুপ্তির পথে। সীমান্ত লাগোয়া হাটবাজারগুলোতেও সিরাজগঞ্জ, টাংগাইল, ঝিনাইদহ, মুন্সিগঞ্জের টেক্সটাইল মিলের লুঙ্গি, চাদর, শাড়ি কাপড় আদিবাসীদের বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
নাব্যতা সংকটে হাট লাগোয়া গনেশ্বরী নদীর বুকে প্রতিনিয়ত চর পড়ছে। এখন বিলুপ্ত প্রায় এই এলাকার বিখ্যাত ভাগনা, গুলশা, জাওর মাছ। লেংগুরাসহ আশেপাশের হাটে এখন পাঙ্গাশ, হাইব্রিড তেলাপিয়া, সিং, কৈ, সিলভার কার্প মাছের বিপুল আমদানি হয়। দিন দিন আশেপাশের উপজেলায় খামারে এসব মাছের চাষ বিস্তার লাভ করছে।
হাটে গড়ে উঠেছে আধুনিক পুঁজির নব্য ব্যবস্থার হাইব্রিড বীজ ও কার্যকরী সার বিষের অনেক দোকান। দারাজ সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর সহ প্রকৃতির বাস্তুসংস্থানের অনেক প্রাণি, পাখি, কীট অকাতরে মরছে। আদিবাসীদের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থা বদলে গেছে। ঢেরস কবিরাজ, রামেশ্বর কবিরাজরা একসময় এই এলাকার হাজং সহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষের অসুখে-বিসুখে, হাত-পা ভাঙায় ছিলেন একমাত্র ভরসা। পাহাড়ি গাছন্ত ঔষধে হাড়জোড়া, বাত ব্যাথা, কালাজ্বরসহ বসন্তরোগের চিকিৎসায় তাঁদের জুড়ি মেলা ভার ছিল। স্বল্পমূল্যের ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন সেসব দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতি ও ঔষধের জায়গায় এখন মুনাফালাভী ক্লিনিক ও এলোপ্যাথি ঔষধের বাজার বেশ রমরমা দেখা মেলে।
গিরিশচন্দ্র বণিক হাটের পুরানো স্বর্ণকার। বংশ পরম্পরায় সুব্রত রঞ্জন বণিক এবং রঞ্জন মণি বণিক এই অঞ্চলে অলংকার বানিয়ে চলেছেন। দক্ষিণের বটতলায় দেখা মিলবে হাটের চটকদার কথার গোসাই বসেছেন ঘা, পাঁচরা, চুলকানির মলম, ছাড়পোকা ইঁদুর আর তেলাপোকা মারার ব্রম্মাস্ত্র নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন।
ইউনুস ডাক্তারের ছেলে সেলিম বিক্রি করছে একচল্লিশ রকমের ঔষধ আর ছয় রকম গাছের মিশেলে তৈরি তার মাজন, মলম আর যৌন দুর্বলতার বিশেষ হালুয়া। তাদের সত্তর বছরের ব্যবসা। হাটুরেদের মাঝে বিচিত্র সব গল্প ছিল। যেমন লেংগুরার চৌকষ ফুটবলার লবেন্দ্র হাজংয়ের কথাই বলা যাক। হাটে বলাবলি হতো, “লবেন্দ্র জিন্দা হাঁস এক টানে ছিড়ে রক্ত খেয়ে মাঠে নামে শুনিছু!” এক কিকে গোল করা আর বল কিক মেরে প্রতিপক্ষের পা ভেঙে ফেলার বহু গল্প চাইর আছে লবেন্দ্রকে নিয়ে। এছাড়াও রমা হাজং সহ অনেক বিরল প্রতিভাধর হাজং খেলোয়াড় ছিল।”

গারো আলু, চিংড়া বাঙ্গি, মোড়ল বাঁশ, চাম্বল, সিরিস, কাঁঠাল, নাগেশ্বর কাঠের আমদানি হৃত একসময় প্রচুর। গনেশ্বরী নদীর স্রোতে গাছ ভাসিয়ে নিয়ে আসা হত হাটে। ১৯৮৮ সালের প্রলঙ্কারী বন্যায় উজান থেকে সর্বনাশা এক ঢল নেমেছিল গনেশ্বরী নদীর বেয়ে। প্রমত্তা নদী বেয়ে ভেসে এসেছিল প্রকাণ্ড সব পাহাড়ি বৃক্ষরাজি।
বন্যার পরে গারোরা এসে খবর দিয়েছিল অনেক উজানে পাহাড় ধস হয়েছে, একটি বড় উৎসমুখি ছড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর থেকেই নদীর গভীরতা কমে নৌকায় বানিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। নদীর মাছগুলো কই যেন হারিয়ে যেতে থাকল। গনেশ্বরীর বুকে মোটা বালুচর উজিয়ে উঠল হাটের পাশেই। এরপর বালু উত্তোলনের মেশিন চলতে শুরু করল দিন রাত ধরে।
উন্নয়নের মোড়কে ঐতিহ্যবাহী লেংগুরা হাটের চালচিত্র আমূল পাল্টে গেছে। গনেশ্বরী নদীর উপরে এখন প্রশস্ত ব্রিজ–শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য রাবার ড্যাম। সীমান্তের এই হাটের ছাপড়া ঘর রূপান্তরিত হয়েছে ইটের দালানে। হররোজ চলছে ঢাকাগামী ডে-নাইট কোচ। মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়িরও আনাগোনা চলে। একসময়ের দুর্গম নিস্তব্ধ গ্রামগুলোতেও কোলাহল বাড়ছে। উঠছে পাকা ঘর।
হাল আমলের এই লেংগুরা হাটে ঘুরাফেরা করে মানুষজনের আলাপ-সালাপ শুনি, নড়াচড়া দেখি। দেখেশুনে মনে হয়, সবাই সবকিছু জানেন অথবা কিছুই জেনেও জানেন না। কিন্তু মনে এও প্রশ্ন জাগে আসলেই কি সবাই সব জানেন? তাঁরা কি এখনো এই মাটির বিগত ইতিহাসের কথা ভাবেন? এমনকি নতুন প্রজন্মের হাজংরা কি জানেন তাঁদের স্বীয় জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগের নিগুঢ় কার্যকারণ কি ছিল?
তথ্য সহায়ক:
- সিংহ ১৯৮৩।। মণি সিংহ, জীবন সংগ্রাম, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
- গুপ্ত ১৯৬৪।। প্রমথ গুপ্ত, মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি. কলিকাতা।
- গুপ্ত ১৯৬৪।। প্রমথ গুপ্ত, যে সংগ্রামের শেষ নেই, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি. কলিকাতা।
- কমরেড আইন উদ্দিন (৮০) লেংগুরা, কলমাকান্দা, নেত্রকোণা।
- আলাপন: দিলীপ চক্রবর্তী, সম্পাদক- সপ্তাহ, লালগড় দমদম, কোলকাতা।
- চক্রবর্তী ২০০০।। দিলীপ চক্রবর্তী, গারো পাহাড়ের লাল ফুল এবং, ভাষামুখ, কোলকাতা।
লেখকঃ রিয়াদ আল ফেরদৌস, গবেষক ও সম্পাদক, বালুচর সাহিত্য পত্রিকা।
