অনু গল্প : কলকাতার পথে তুলশীমালার সুবাস

0
89

রফিক মজিদ : ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী বেলা আড়াইটার দিকে কোলকাতা পার্কস্ট্রিট মেট্টো (পাতাল রেল) ধরার জন্য মির্জা গালিব স্ট্রিট থেকে হাঁটছিলাম। উদ্দেশ্য-মেট্টো ধরে প্রথমে রবিন্দ্র সনদ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাসে করে সাইন্স সিটি’র সামনে কোলকাতা পুস্তক মেলায় যাবো। এতে খরচও অনেক কম হবে, শহরটাও দেখা হবে। আমি ছিলাম হোটেল গ্রীণ স্টারে। হোটেল থেকেই রেড়িয়েই যাত্রা শুরু করি মেলার উদ্যেশে। ওই দিন মেলায় “বাংলাদেশ ডে” উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে তৎকালীন সাংস্কৃতি মন্ত্রী ও দেশটিভি চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অভিনেতা বাকের ভাই খ্যাত আসাদুজ্জামান নূর প্রধান অতিথি ছিলেন। মির্জা গালিব স্ট্রিট থেকে মিনিট খানিক হাঁটার পর প্রায় ত্রিশউর্দ্ধ এক বিদেশিনীকে লক্ষ্য করলাম আমার পাশাপাশি হেঁটে চলছে। সাদা চামরা ও স্বর্ণকেশী ওই বিদেশিনীর পড়নে জিন্স ও টি সার্ট থাকলেও অনেকটা শালিনতা ছিল তার চাল-চলনে। পিঠের উপর স্পোর্টস ব্যাগের মতো একটি ছোট ব্যাগ ঝোলানো ছিল।

হাঁটার এক পর্যায় আমার শেরপুরের বাল্য বন্ধু বিশ্বজিৎ আমি কলকাতা এসেছি পূর্বে থেকেই জানে তাই ভারতীয় সিম থেকে আমার মোবাইলে ফোন দিলো। বিশ্বজিৎ তার ছেলেকে পড়াতে দু’বছর আগেই কলকাতায় অবস্থান করছিলো পরিবার নিয়ে। ফোন করেই জিজ্ঞেস করলো- ‘মেলায় কখন যাবি? আমি তোর বউদিকে নিয়ে বের হচ্ছি।’ আমি বললাম, ‘এই তো রাস্তায়, তুই চলে আয়।’ বিশ্বজিৎ জিজ্ঞেস করলো, ‘চিনবি তো? কীভাবে আসছিস।’ আমি বললাম, ‘সমস্যা নেই, চিনে নিবো। এর আগে তো অনেকবার কলকাতায় আসছি, সাইন্সসিটি বাস ধরে চলে আসবো। তুই মেলায় পৌঁছে ফোন দিস, বলে ফোন কেটে দিলাম।’

এদিকে ওই বিদেশীনির পায়ে পায়ে আমিও এক সাথেই চলছিলাম। বিদেশীনি আমার মোবাইলে কথা শুনে বুঝতে পারলো আমি বাংলাদেশ থেকে আসছি। তাই সে একটু আগ্রহী হয়েই জিজ্ঞেস করে, ‘আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ? আমি বললাম, ‘ইয়া, ইউ? ‘আই এম ক্রিষ্টিনা মেরী ফ্রম ইতালি’ এ কথা বলেই সে তখন চমৎকার ও শুদ্ধ বাংলায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাবে বলতে লাগলো, ‘আমি তোমার দেশে গিয়েছিলাম। ৬ মাস ছিলাম। আমি ইতালির ফান্ডে ছিন্নমূল শিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের দক্ষিন এশিয়া ব্লকের বাংলাদেশের ফিল্ড অর্গানাইজার হিসেবে আছি। সে কারণে বাংলাদেশের শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি হিল এলাকার একটি স্কুলে কিছুদিন কাজ করেছি।’ আমার চোখ তখন ছানাবড়া হয়ে উঠে। এক্কেবারে শেরপুরের কথা শুনে আমি একটু থেমে যাই। আশ্চর্য হয় জিজ্ঞেস করি, শেরপুর? আরে আমার বাড়িও তো শেরপুরে।’ সেও আমার কথা শুনে তার হাঁটার গতি থামিয়ে বলে উঠলো, ‘ওয়াও… ভেরি নাইস। তোমার গ্রাম ( শেরপুরকে গ্রাম হিসেবে ধরে নেয়) খুবই সুন্দর। গজন (গজনি) পাহাড়টাও বারি (ভারি) সুন্দর। মানুষগুলো আরো সুন্দর। এক্সিলেন্ট এন্টারটেনমেন্ট।

ঝিনাইগাতি গান্ধগান (গান্ধিগাঁও) গ্রামের যে স্কুলে আমি কাজ করেছি সেখানের এক লিডার আমাকে একদিন তার বাসায় দাওয়াত করিয়া খাইয়েছিলো। তোমাদেও দেশের পোলাও, মাংস আর পয়েশ এর (পায়েশ) ফ্লেবার তো আজও ভুলতে পারিনাই। ওয়াও হেবি টেষ্টি, কি যেন চাল দিয়ে পোলাও আর পায়েশ টা রান্না করছিলো আমার মনে নাই। মে বি টুলশি… টুলশি বলতেই আমি বুঝে গেলাম এবং বললাম বুঝেছি ‘তুলশীমালা চাল’। সাথে সাথে সে বললো, ‘ইউ আর রাইট। টুলশি মালা হবে।’

এভাবে প্রাণবন্ত আলাপচারিতায় কখন যে দীর্ঘ প্রায় এক কিলো পথ সংক্ষিপ্ত হয়ে গেলো বুঝতে পারি নাই। পার্কস্ট্রিট মেইন রোডে চলে আসি। এবার আমার পথ ডান দিকে মেট্টো রেলের (পাতাল রেলে) স্টেশনের দিকে। ভাবলাম ক্রিস্টিনাও আমার সাথে অন্তত পাতাল রেল পর্যন্ত হয়তো যাবে। কিন্ত না, সেই বলে উঠলো, ‘কোন দিকে যাবে?’ আমি বললাম, ‘মেট্টোতে (পাতাল রেলে)।’ ওহ, স্যারি আমি (বায়ে দেখিয়ে) ওদিকটায় যাবো। থ্যাংকিউ সো মাচ, খুব ভালো লাগলো। বাংলাদেশে হয়তো আর যাওয়া হবে না, কারণ আমি এবছর দেশে ফিরে এ চাকুরি আর করবো না, এটা ছেড়ে দিবো। লোকাল কোন কোম্পানীতে কাজ করবো। শ্রীলংকা, নেপাল, বাংলাদেশ, ভারতের ওয়েষ্ট বেঙল (পশ্চিম বাংলা) থাকলাম ৫ বছর হলো। বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট বাঙলায়ই বেশী থাকলাম। তাইতো বাংলা শিখে গেলাম। তবে তোমার দেশের পায়েশটার স্বাদ ভুলবো না কোন দিন। ভালো থাকবে, বাই বাই’ বলে হ্যান্ড সেক করে তার গন্তব্যে পা বাড়ালো।

সংক্ষিপ্ত পথ, সক্ষিপ্ত সময় আর সক্ষিপ্ত পরিচয়ে ক্রিষ্টিনার আর কোন পরিচয় জানা সম্ভবও হয়নি। আর আমার সম্পর্কেও তেমন বলার সুযোগ হয়নি। ক্যামেরা বা এন্ড্রয়েড ফোন না থাকায় তার সাথে সেলফিও তোলা হয়নি। তবে মনের মাঝে ক্রিষ্টিনার সংক্ষিপ্ত বন্ধুত্ব আর ’শেরপুরের তুলশীমালা চালের সুনামের কথা ভুলবো না কোন দিন’। মনে মনে ভাবলাম-সেই জমিদার আমল থেকে চলে আসা এ অঞ্চেলের তুলশীমালার চালের সুবাস আমরা প্রায় ভুলেই বসেছিলাম। সম্প্রতি ‘তুলশীমালা চাল’ শেরপুর জেলার ব্র্যান্ডিং হওয়ায় আবার এ তুলশীমালার সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে দেশ তথা সারা বিশ্ব জুড়ে। কলকাতার পথে নিজের দেশের উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে নিজ জেলার পণ্যের সুনাম শুনে বুকটা ভরে উঠলো। যেনো কলকাতার রাস্তায় তুলশীমালার সুবাস ছড়াচ্ছে। আস্তে আস্তে ফুরফুরা মেজাজে উরু উরু মনে পার্কস্ট্রিট মেট্টো রেলের প্রবেশদ্বারের সিড়ি বেয়ে নেমে গেলাম স্টেশনে।

লেখক : সাংবাদিক ও কবি।