সকালে কথা, সন্ধ্যায় নেই

0
215
Soumitra Sekhar

সৌমিত্র শেখর : ’আমার বাল্যবন্ধু বাবলা। ওর পোশাকি নাম দিলীপকুমার বসাক। স্কুলে পড়তাম একই সঙ্গে। ও কবে ভর্তি হয়েছিল মনে নেই, কিন্তু প্রায় দশটি বছর একই সঙ্গে কাটিয়েছি। স্কুলের কাছাকাছি ওর বাড়ি। সময় পেলেই চলে যেতাম। ওর মাকে বলতাম জেঠিমা। দারুণ আচার বানাতেন। ওদের বাড়িতে ছিল কুলের গাছ। বাজারও কাছে ছিল। জেঠামশাইকে দিয়ে নানান পদের টকফল আনিয়ে জেঠিমা আচার দিতেন এবং বিলাতেন। আমি যে কতো আচার খেয়েছি সেই ছোটোবেলায়, মনে নেই। অনেকগুলো বোনের একটি ভাই বলে বাড়িতে আদরও ছিল বাবলার। বাবলা আমার ভালো বন্ধু ছিল। তাই সেই আদরের কিছুটা চুইয়ে আসত আমরা, সহপাঠীদের দিকে। আমাদের আর এক বন্ধু বিশ্বনাথ চক্রবর্তী; আমরা বলতাম বিশু। ওর দাদু ছিলেন শেরপুরের বিখ্যাত গেন্দা কবিরাজ। ওদের বাড়িকে বলা হতো ‘কবিরাজ বাড়ি’। বিশু আনত চ্যাবনপ্রাস। কী চমৎকার গন্ধ আর স্বাদ! একজন স্যারতো ক্লাসেই বিশুর কাছে চ্যাবনপ্রাস চাইতেন। সহপাঠীদের মধ্যেও বাবলা আর বিশুর সমাদর ছিল বেশি। কিন্তু অন্যরা জানত না, আমার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাবলাদের বাড়ির অন্দরমহলে। জেঠিমার আদর আমি পাই, সঙ্গে নানা রকমের আচারও। বিশুর সঙ্গে সখ্যভাব থাকলেও ওর বাড়ি অবধি যাওয়া হয়নি। কারণ, বিশুর সুন্দর একটা বোনও পড়ত আমাদের সঙ্গে। ওর সঙ্গে কৈশোরক লজ্জায় তখন কথা বলতাম না, শুধু বিশুর সঙ্গে কথা বলতাম। সেই লজ্জা আর কাটেনি। ফলে, চ্যাবনপ্রাস বেশি খেতে পারিনি। বাবলার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা গাঢ়তর হয়। বাবলার বাবা খুব হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। নানা টোটকাও জানতেন বলে লোকে সমীহ করত। স্কুলজীবনে একবার আমাকে কুকুরে কামড়ায়। বাবা হাসপাতাল থেকে আমার নাভির চারপাশে চৌদ্দটি ইনজেকশান দেবার আয়োজন করেন এবং আমি সেগুলো গ্রহণ করতে বাধ্য হই। এরই মধ্যে বাবা আবার সিদ্ধান্ত নেন, কোনো চিকিৎসা বাদ দেবেন না। ফলে বাবলার পিতার কাছ থেকে টোটকাও আমাকে দিয়ে গ্রহণ করাবেন। বাবলার পিতার নাম কাশীনাথ বসাক, লোকে কাইশ্যা বসাক বলে ডাকে। বাবা এক সকালে আমাকে ধরে আনলেন বাবলাদের বাড়িতে। বাবা জানতেন না, আমি এই বাড়িতে ভালোই পরিচিত। অবশেষে, বাবার সামনে ঔষধ তৈরি হলো। অনেকগুলো গোলমরিচ বাটাসহ আর কী কী যেন! লেইয়ের মতো ঔষধ তৈরি হলো। আমাকে ভোরবেলায় পূর্ব দিকে মুখ করে কুকুরের মতো চতুস্পদরূপ নিয়ে কচিকলাপাতা থেকে সে ঔষধ চেটে চেটে খেতে হয়েছে পর পর সাত দিন! ঔষধ খাওয়ার পর আমার গলা যেন জ্বলে যেত। কিন্তু সঙ্গে থাকত জেঠিমার অমৃত আচার; প্রশান্তি পেতাম বেশ। সেই বাবলা কিন্তু আমাদের সঙ্গে কলেজের আঙ্গিনায় প্রবেশাধিকার পায়নি। ফলে আমাদের আপাত বিচ্ছিন্নতা ঘটে। আমি কলেজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা মাড়িয়ে আবার যখন শেরপুরে আসি একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে, তখন আবিষ্কার করি বন্ধু বাবলা একটি মনোহারি দোকানের অধিপতি। জেঠামশাই বয়সের ভারে খানিকটা কাবু। ছেলেকে আয়রোজগারের সৎ পথে নামিয়েছেন তিনি। বন্ধুটিও পানখাওয়া আর মাছধরা ছাড়া কোনো নেশায় জড়ায়নি। বাবলার সঙ্গে আবার আমার যোগাযোগ হয়। আমি আবার শেরপুর ত্যাগ করলেও সে সংযোগ থাকে। ছুটিছাটাতে বাড়িতে গেলে বাড়ির মনোহারি দ্রব্যসামগ্রী ওর দোকান থেকেই নিয়ে নিই আর বসে আড্ডা দিই সন্ধ্যায়। সন্ধ্যায় ওর বেচাকেনা একটু কম থাকত। আমাকে দেখেই বলত, ‘আও, বও’। আমি ওর ক্যাশবাক্সের পাশে গদিতে মজা করে পাগুটিয়ে বসতাম। চা বা কফি আসত, চানাচুর মাখা হতো; আড্ডা দিতাম। স্কুলজীবনে আমরা ঝড়ঝাপটা ‘তুই’ বলতাম, পরে হলো ‘তুমি’। হোক। কিন্তু আন্তরিকতার কমতি ছিল না। কখনো কখনো আমাকে বলত, ‘দুইভাই একসঙ্গে থাকব’। এ বছরের শুরুতেই বাবলা আমাকে জানিয়েছিল, আর্থিকভাবে বেশ চাপে আছে সে। আমি বলি, কেন? তোমার দুটো সোনার ছেলে সরকারি স্কুলে পড়ে। বৌদির কোনো বাড়তি চাহিদা দেখি না। বাবলা কিছু বলে না। ওর সঙ্গে আমার দেখা হয় এ বছর মার্চ মাসের পহেলা তারিখে। তারপরতো লকডাউন। ফোনে কথা হতো। দুমাস আগে এক সকালে তেমনি ফোনে কথা হলো। ফোনেই শুনলাম প্রচণ্ড কাশির আওয়াজ। কী করে হলো? বলে, দোকানের হালখাতা করেছে বৃষ্টিতে ভিজে; ঠান্ডা লেগেছে। আমাকে সান্ত্বনা দেয়, চিন্তা নেই, গতকালই ডাক্তার দেখিয়েছি। সকাল দশটায় ওর সঙ্গে ফোনে কথা হলো: সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ফোনেই জানলাম বাবলা চিরবিদায় নিয়েছে! চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে। সকাল আর সন্ধ্যার এই ব্যবধান?’

সূত্র : ফেসবুক