নয়আনী জমিদার বাড়ীর স্মৃতিচারণ, রোজিনা তাসমিন

0
335
রোজিনা তাসমিন
কবি : রোজিনা তাসমিন

রোজিনা তাসমিন : অনেকের মত আমিও একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাব। তাই বেঁচে থকতে আমার দেখা নয়আনী জমিদার বাড়ীর কিছু স্মৃতি শেয়ার করতে চাই। জমিদার বাড়ীটি ছিল চারিদিকে জলাশয় দ্বারা বেষ্টিত। এই জলাশয়কে আমরা গাঙ্গিনা বলেই জানি। গাঙ্গিনার পাড়েই ছিল আমার বাবার বাসা। ছোটবেলায় বাবার মুখে শুনেছি জমিদার কন্যা নাকি বিকেলে নৌকা নিয়ে গাঙ্গিনায় ঘুরতেন। সঙ্গে হারমোনিয়াম থাকতো। ভালো গাইতেও পারতেন। পাড়ে দাঁড়িয়ে হাটের দিন অনেকেই জমিদার কন্যার গান শুনেছেন। এসব গল্প শুনতে শুনতে আমরা বড় হলাম। একাত্তরের আগের কথা। তখন ক্লাশ থ্রীতে পড়ি। জমিদার বাড়ীটি ছিল ঝোপঝারে ভরা। বাড়ীর উত্তরের জঙ্গলটায় দিনের বেলায় ঢুকতেই ভয় করতো। তার পরেও পাড়ার কয়েকজন এক সাথে মিলে গাঙ্গিনা সাঁতরে ওখানে ভয়ে ভয়ে যেতাম। কারণ ওখানে একটা বিরাট তেঁতুল গাছ ছিলো এবং তেঁতুলটা মিষ্টি ছিলো। গাছের তলায় অনেক পাকা তেঁতুল পড়ে থাকত। আমরা গামছায় বেঁধে সইসব পাঁকা তেঁতুল আনতাম। জঙ্গলটার উত্তর পাশে জামান মডার্ণ হসপিটালটা যে পাশে সখানে ছিল একটা বড় খেজুর গাছ। পাকা খেঁজুরও টুকাতাম প্রায়ই। তখন জমিদার বাড়ীতে শেরপুর কলেজের ছাত্রাবাস ছিলো। কলেজের কোন কোন শিক্ষক এবং নাইট গার্ড পরিবার নিয়ে থাকতেন। জমিদার বাড়ীর ঐ জঙ্গলের ভিতর একটা ঘাট বাঁধানো পুকুর ছিলো। জঙ্গলের ভিতরে বিধায় পাতা পড়ে পানিটা কালো হয়ে থাকতো। কেউ কেউ বরশী ফেলে মোটা মোটা কালো টাকি মাছ ধরতো। কেঁচো দিয়ে বরশী ফেললেই টপটপি মাছ খেতো। এখন যেখানে ডিসি ভবন এখানে শানবাঁধানো একটা পুকুর ছিলো। পুকুরের গা ঘেসে চুনসুরকির একটা পুরোনো বিল্ডিং ছিলো। বিল্ডিং এর দক্ষিনে একটা বিরাট লিচু গাছ ছিলো। আমাদের বাসা থেকে এটা সরাসরি দেখা যেত। এখানে শিক্ষকরা থাকতেন। ৭৬-৭৭ তে বাংলা বিভাগের তাহের স্যারকে থাকতে দেখেছি। ভিতরে আরো কয়েকটা বিল্ডিং ছিলো। এখন যেটা ডিসি উদ্যান এর উত্তর দিকে পুকুরের আরেকটা ঘাট ছিলো। নয়আনি বাজারের বহু লোক এই ঘাটে গোসল করতে আসত, আমরা বাসা থেকে দেখতাম। একাত্তরের বিজয়ের পর ভারত থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা এখানে ক্যাম্প করে। বেশ কিছুদিন এখানে ছিলো। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সেকি আনন্দ উল্লাস। তাহের স্যার যে বিল্ডিংটায় থাকতেন তার বারান্দার ছাদ থেকে কত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি জয়বাংলা বলে পুকুরে ঝাপ দিয়ে খেলা করতে। ওদের আনন্দ উল্লাস দেখতে আমাদেরও ভালো লাগত। ওরা বিকেলে গাঙ্গিনার পাড়ে বরশী ফেলে মাছ মারতো, ভারত থেকে আনা কমলা বিস্কুট খেতো, ঢিল দিয়ে এপাড়ে আমাদেরকেও দিতো। আজও মনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা একটা ভাইয়ার নাম ছিলো বিদ্যুত। দেখতে কালো এবং ছিপছিপে মাঝারি গড়নের ছিলো। কিন্তু খুব ত্যাজি ছিলো। একদিন একজন মুক্তিযোদ্ধা গ্র্যানেড নিয়ে গাঙ্গিনায় মাছ মারতে এলো। ওদের কাছে তখন অনেক অস্ত্র, প্রায়ই আকাশে রাইফেলের গুলি ছুঁড়ে আওয়াজ করতো, গাছ থেকে নারকেল পারতো। আমরা ভয় পেতাম। ভীযণ শব্দ হতো। কানে আঙ্গুল দিয়ে থাকতাম। যে মুক্তিযোদ্ধাটা গ্র্যানেড দিয়ে মাছ ধরতে এলো তার নাম হয়ত বাচ্চু ছিলো। বাচ্চু গ্র্যানেডের প্রিন্টারটা খুলে হাতে নিয়ে পানির দিকে যাচ্ছিলো, হঠাৎ ওর হাতেই গ্র্যানেডটা ব্রাস্ট হয়ে যায়। বাচ্চু পানিতে পড়ে যায়। বিকট শব্দে চারিদিক কেঁপে উঠে। গাঙ্গিনার পানি ভীষণ বেগে দুলতে থাকে। বাচ্চুর ডান হাতটা উড়ে যায়। ওর আশে পাশের পানি লাল হয়ে যায়। বড় বড় মাছ ভেসে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্যরা দৌড়ে এসে ওকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই ওর মৃত্যু হয়। মূহুর্তেই সবকিছু কেমন নীরব হয়ে যায়। এর পর আর মুক্তিযোদ্ধাদের আনন্দ উল্লাস চোখে পড়েনি। ক্যাম্পও উঠে গেলো। পরে শেরপুর কলেজের ছাত্রাবাস হলো।

ডিসি উদ্যানের উত্তর পশ্চিম কোণে নয়আনি জমিদারের রংমহল ছিলো। কাঠের দুতালায় চারিদিকে বারান্দা ছিলো। আমরা ছেলেমেয়েরা ভয়ে ভয়ে দুতালায় উঠতাম।ওর ভেতরকার সৌন্দর্য দেখার জন্য। কাঁঠের গায়ে খোঁদাই করা নক্সায় কি অপূর্ব রং ছিলো। সেইসব চিত্র মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আমরা। চিত্রগুলি আমাদের চোখে বিস্ময় এবং খুব উপভোগ্য ছিলো। কোনটা নর্তকী কোনটা পালকী কোনটা রাজা কোনটা ঘোড়া কোনটা ঢুলি কোনটা পাখি ছোঁয়ে ছোঁয়ে আমরা দেখতাম আর অবাক হতাম। বারান্দার চালের নীচে চারিদিকে টিনের ঝালরকাটা ছিলো। দোতালায় ছোট ছোট জানালায় রঙ্গিন গ্লাস ছিলো। বাইরে থেকে কেউ উঁকি দিলে ভিতর থেকে দেখা যেত। কিন্ত যে উকি দিতো সে ভিতরের কিছুই দেখতে পেতোনা। বিরাট বিরাট গজারি খামের উপর ঘরটা তৈরী ছিলো। অনেক দামী মূল্যবান কাঠ ছিলো এই ঘরটায়। এই জলসা ঘরটা যদি থাকত তবে এটা অবশ্যই একটা দর্শনীয় স্থান হতো। সম্ভবত বিএনপি আমলে ২০০৩ সালে রংমহলটা নিলামে তুলে ভেঙ্গে ফেলা হলো। ক্ষমতাসীনদের লোভের আগুন থেকে ওটাকে বাঁচানো গেলোনা। এই রংমহলের জন্য আমি নিজে আমার বাবাকে কাঁদতে দেখেছি। আমার বাবার মত হয়ত আরো অনেকে নীরবে কেঁদেছেন। যারা ইতিহাস আর ঐতিহ্য প্রিয় লোকছিলেন। সেদিন আমার বাবার কান্নার অর্থ আমি বুঝিনাই। আজ বুঝি। সেদিন কেন সব মানুষ একসঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় তুলেনি, তুললে সার্থান্বেষী মহল অবশ্যই দমে যতো। আমাদের ঐতিহ্য ধংস হতোনা, রক্ষাপেত দূর্বৃত্তের হাত থেকে। একজন ডিসি নয়আনি জমিদার বাড়ীটা ভেঙ্গে তসনস করে দিয়ে গেছে আরেকজন ডিসি আবার এটাকে সাজিয়েছে নুতন রূপে। নয়আনি জমিদার বাড়ী এখন ডিসি ভবন জজকোর্ট ডিসি উদ্যানে রূপ নিয়েছে। গাঙ্গিনা এখন হয়েছে ডিসি লেক। আমরা এর তীরবর্তি প্রতিবেশীরা নীরবে এর ধ্বংসাত্মক পরিবর্তনই শুধু দেখে গেলাম বুক ভাঙ্গা কষ্ট নিয়ে চোখের জলে।