ঘুরে আসুন ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের তীর্থস্থান গারো পাহাড়ের ‘সাধু লিউর খ্রীষ্ট ধর্মপল্লী’

0
551
বারোমারি খ্রিস্টান মিশন

রফিক মজিদ : শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় বারোমারীতে ১৯৪২ সালে পর্তুগালের খ্রীষ্টান মিশনের আদলে ৩৯ একর জমির উপর গড়ে উঠে খ্রিস্ট মিশন। এছাড়া এ ধর্মপল্লির নিজস্ব আরো ১০ একর আবাদি জমিও রয়েছে। নালিতাবাড়ি নাঁকুগাও স্থল বন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোষ্ট থেকে ঝিনাইগাতি রাংটিয়া সীমান্ত সড়কের পাশেই বারোমারি বিজিবি ক্যাম্পের অদুরে এ খ্রিস্ট ধর্ম পল্লি স্থাপন করা হয়।

২০০০ সালের জুবলি বর্ষ পালনের প্রস্তুতি সরূপ ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি সময়কালে ময়মনসিংহ ধর্ম প্রদেশীয় পালকীয় পরিকল্পনা সাধারণ সভায় প্রয়াত বিশপ ফ্রান্সিস এ গমেজ এর নেতৃত্বে বারমারী ধর্ম পল্লিতে ফাতেমা রাণীর তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৯৮ খ্রীষ্টাব্দে (সালে) জুবলি বর্ষের প্রস্তুতি সরূপ ২৯ অক্টোবর থেকে প্রতিবছর এখানে খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীরা তাদের বার্ষিক ‘তীর্থ উৎসব’ পালন করে আসছে। ভারত সীমান্ত ঘেষা পাহাড়ের চুড়ায় ও মনোরম পরিবেশে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই দিন ব্যাপী এ বার্ষিক তীর্থৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই এ তীর্থৎসবে প্রতিবছর ভক্তদের ভির ক্রমেই বাড়ছে।

বারোমারি খ্রিস্টান মিশন

এখানে তীর্থ স্থান করার পর নির্মান করা হয় পাহাড়ি আকাবাঁকা ও উচুনিচু ক্রুশের পথ। যেখানে যিশু খ্রিস্টের বিভিন্ন নামে ক্রুশ রয়েছে মোট ১৬ টি। পহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় রয়েছে একসাথে তিনটি ক্রুশ ও যিশুর সমাধি। এছাড়া ধর্মপল্লি বা মিশনের প্রবেশ পথের একটু সামনে মূল অফিস ও চার্জ বা গীর্জায় যাওয়ার পথে পাহাড় বেয়ে যাওয়া রাস্তার ডান পাশে স্থাপন করা হয়েছে শিশু খ্রিস্টের প্রতিকৃতি। সে প্রতিকৃতি যিশু দু’হাত তুলে প্রার্থনার ভঙ্গিমায় রয়েছে। এছাড়া মিশনের মাঝামাঝি স্থানে দৃষ্টি নন্দন লেকের পশ্চিম পাশে হাত তুলে আর্শিবাদের ভঙ্গিমায় আরো একটি যিশুর প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে। চারদিক থেকে পাহাড় বেষ্টিত তীর্থের মূল আচার অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে পশ্চিম পাশের পাহাড়ের টিলার উপর ম্যারি খ্যাত মা মরিয়ম এর প্রায় ৪৭ ফুট সুউচ্চ প্রতিকৃতি ধর্মপল্লির মূল আকর্ষন। প্রতিবছর তীর্থৎসবে আগতরা সে প্রতিকৃতিতে নানা ভাবে প্রার্থনা জানায়।

বারোমারি সাধূ লিউর ধর্ম পল্লি সূত্রে জানাগেছে, ময়মনসিংহ ধর্ম প্রদেশের নিয়ন্ত্রনে ১৫ টি ধর্মপল্লির মধ্যে শেরপুর জেলায় রয়েছে ২ টি ধর্মপল্লি। এরমধ্যে জেলার ঝিনাইগাতি উপজেলার ভারুয়ামারী গ্রামে ‘মরিয়মনগর সাধু জজ খ্রীষ্টান ধর্মপল্লি’ এবং নালিতাবাড়ি উপজেলার এই বারোমারিতে ‘সাধু লিউর খ্রীষ্টান ধর্মপল্লি’ রয়েছে। অন্যান্য ধর্ম পল্লিগুলো জামালপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত। শেরপুর জেলার এ দুটি ধর্মপল্লির মধ্যে মরিয়মনগরে ৮ হাজার এবং বারোমারীতে প্রায় সারে ৪ হাজারসহ সর্বমোট প্রায় ১২ হাজারেরও বেশী রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান আদিবাসি রয়েছে বলে সূত্র জানায়। তবে সাধু লিউর ধর্ম পল্লিটি প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ এবং আয়তনে বেশ বড় হওয়ায় এটিকে ১৯৯৭ সালে তীর্থস্থান ঘোষনা করা হয়।

বারোমারি খ্রিস্টান মিশন

এ তীর্থৎসবে দেশের বিভিন্ন জেলা এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশের খ্রিস্ট ভক্ত প্রায় ৫০ হাজার লোকের সমাগম ঘটে। সেই সাথে এ তীর্থৎসবকে ঘিরে ওই সীমান্ত এলাকায় খ্রিস্টান-মুসলিম-হিন্দু ও আদিবাসী-বাঙ্গালী মানুষের মাঝে মিলন মেলায় পরিনত হয়। তীর্থৎসবের দক্ষিন পাশে সীমান্ত সড়ক সংলগ্ন মাঠে বসে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়দের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পোষাক ও তদের হস্তশিল্পের তৈরী বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী এবং আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন খেলনার জমজমাট মেলা। তবে সে মেলা শুধুমাত্র গারোদের মাঝেই সীমাবদ্ধই থাকে না। মেলায় আগত অসংখ্য বাঙ্গালী মুসলমানদের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয় এবং বেশ আকর্ষনীয় হয়। মেলায় পার্বত্য এলাকার ঐতিহ্যবাহী নানা আসবাবপত্র ও বস্ত্র সম্ভারের মেলা জেলার এটাই একমাত্র হওয়ায় জেলার নানা ধর্ম-বর্ণ ও পেশার মানুষ ভির করে। তর্থীৎসবের প্রথম দিন সকাল থেকে শুরু হয়ে পরের দিন দুপর পর্যন্ত চলে বেঁচা-কিনি।

বারোমারি খ্রিস্টান মিশন

প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া তীর্থে বিকেলে ধর্মীয় আলোচনার মধ্যদিয়ে মূল আনুষ্ঠিকতা শুরু হয়। প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন ‘মুল সূর’ বা ‘থিম’ কে সামনে রেখে আয়োজন করে নানা আনুষ্ঠিকতা। তবে তাদের ধর্মীয় আঁচারের কোন পরিবর্তন হয়না। তীর্থৎসবে আয়োজন করা হয় পাপ স্বীকার, খ্রীষ্ঠজাগ, আলোর মিছিল বা আলোর শোভাযাত্রা, সাক্রামেন্তের আরাধনা ও নিরাময় অনুষ্ঠান, জীবন্ত ক্রুশের পথে তীর্থযাত্রা, মহাখ্রীষ্ঠযোগ, নিশি জাগরণ, ধর্মীয় আলোচনাসহ নানা অনুষ্ঠানমালা।

তীর্থৎসবের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার রাতে উপস্থিত খ্রীষ্ট ভক্তরা (প্রায় ৫০ হাজার খ্রীষ্টভক্ত নর-নারী ও শিশুরা) মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোর শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। আলোর শোভাযাত্রাটি মিশনের প্রায় ৪ কিলোমিটার পাহাড়ি উচু-নিচ পথ মাড়ানোর সময় আলোকিত হয়ে উঠে গারো পাহাড়ের আকাশ। পরের দিন শুক্রবার সকাল ৮টায় শুরু হয় জীবন্ত ক্রুশের পথে তীর্থ যাত্রা। সবশেষে মহাখ্রীষ্টজাগ এবং দেশ ও বিশ্বের সকল মানুষের জন্য মঙ্গল কামনা করে তীর্থৎসবের আনুষ্ঠনিকতা শেষ করা হয়। তীর্থৎসবে আগত ভক্ত ও খ্রীষ্টানরা ধর্মপল্লি’র ভিতর প্যান্ডেল তৈরী করে রাত্রি যাপন এবং গোসল, অস্থায়ী বাথরুমের ব্যবস্থা করা হয়। কেউ নিজেরা রান্না করে খায় আবার কেউ মেলায় মাঠে অস্থায়ী হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করেন।

বারোমারি খ্রিস্টান মিশন

তীর্থৎসবের আয়োজকরা জানায়, প্রতি বছরই এ তীর্থৎসবে লোকসমাগম বেড়েই চলছে। দেশে আদিবাসী ও বাঙালী খ্রীষ্টানদের পাশাপাশি দেশ অবস্থানরত নানা দেশের খ্রীষ্টান ভক্ত এবং তীর্থৎসব উপলক্ষেও নানা দেশ থেকে খ্রীষ্ট ভক্তরা ভির করে। বিশেষ করে পাশ্ববর্তী ভারত থেকেও অসংখ্য খ্রীষ্ট ভক্তরা আসেন এ তীর্থৎবসে। মিশনের নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীদের পাশপাশি তীর্থৎসব শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করতে জেলা পুলিশ ও বিভিন্ন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। শেষদিন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের কেন্দ্রী উপদেষ্টা প্রয়াত সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন সমাপনি খ্রীষ্টজাগে অংশ গ্রহন করলেও বর্তমানে তার ছেলে বর্তমান উপদেষ্টা ময়মনসিংহ-১ (ফুলপুর-ধোবাউরা) আসনের সাংসদ জুয়েল আড়েং অংশ নেয়। তীর্থৎসবের শেষ দিন শুক্রবার প্রার্থনা পরিচালনা করেন ময়মনসিংহ ধর্মপল্লীর বিশপ পনেল পল কুবি।

বারোমারি খ্রিস্টান মিশন

এ খ্রীষ্টান ধর্ম পল্লিটি’র তীর্থৎসবে আস্তে আস্তে যেমন লোক সমাগম বাড়ছে ঠিক তেমনি এর নাম দেশ-বিদেশেও ব্যাপক প্রচারিত হচ্ছে। ধর্মপল্লির পাহাড় ও ছায়া ঘেরা মনোরম পরিবেশও মানুষকে বেশ আকর্ষনীয় করে। তাই তীর্থৎসব ছাড়াও সারা বছর জুড়েই দেশ-বিদেশী নানা পর্যটকরা আসেন এ ধর্মপল্লি বা মিশনের দর্শনে। তবে ধর্মপল্লির অনুমতি সাপেক্ষে ভিতরের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করা যাবে।

লেখক: সম্পাদক নন্দিত শেরপুর