কৃষকের কাছে আর কৃষি নেই

1
107
আনার কলি মাহবুব

জ্যোতি পোদ্দার : ’একপাশে দশানি অন্য পাশে মৃগি-দু’টিই ব্রহ্মপুত্রের কোল থেকে বেড়ে ওঠা আঞ্চলিক নদী। মাঝখানের নিঝুৃম চাতালের নাম জঙ্গলদী। প্রাণ ও প্রকৃতির প্রাচুর্যে ভরপুর। পাখ পাখালি যেমন তেমনি দানাশস্য আর মৌসুমি শাক সব্জী। উত্তর জনপদের শস্যভাণ্ডার এই চরাঞ্চলের বলাইচর ইউনিয়ন।

এখানেই বসেছে কৃষক ও কৃষাণীদের নিয়ে বারদুয়ারী বৈঠক। বিষমুক্ত সব্জী চাষ বিষয়ক উদ্বুদ্ধকরণ সভা। মাঠের কাজের কাজিদের নিয়েই পশ্চিমপাড়ায় আড়াবাড়ির বৈঠক।

এখানকার একাংশ কৃষক কৃষাণী নিজস্ব জমিতে নানা ধরনের বিষমুক্ত শাক সব্জী উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে। আরো অনেককে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য এই আয়োজন।

এ পাড়ার ইশরাত জাহান, খুনুয়ার হালিমা খাতুন কৃষাণীরা বিষমুক্ত শাক সব্জি উৎপাদনে তৎপর কেননা রাসায়নিক সার প্রয়োগের প্রথম কোপটি পড়ে নারীদের উপর।

প্রান্তিক কৃষাণী প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে কৃষি উৎপাদন ঝাড়াই বাছাই কাজে জড়িত। কাজেই রাসায়নিক সারের বিরুদ্ধতা নারীর থেকে আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে বা যারা বিষমুক্ত সব্জী উৎপাদন করছে তার পণ্যের নায্য মূল্য পাচ্ছে না। বিষমুক্ত সব্জি চাই কিন্তু তার জন্য পাচ টাকা বেশি খর্চা করতে আমাদের সয় না।

অধিক লাভের আশায় অধিকাংশ কৃষক বিষযুক্ত শাক সব্জি উৎপাদন করছে। জৈব সার বা ভার্মি কম্পোট দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের খর্চা বেশি হবার কারনে সে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। বাজারে বিষমুক্ত ও বিষযুক্ত পণ্যের ভিন্ন দামের কারনে বিষমুক্ত কৃষকের পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কৃষক বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ চান। আলাদা বাজারের কথা বললেন। কিন্তু আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি মুক্তবাজার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারপরও আছে দৈত্যরাজ নানা বিষ কোম্পানি। অল্প জমিতে অধিক অধিক ফলনের লোভ দেখিয়ে কৃষককে বাজারমুখী করে ফলেছে্।

কৃষকের কাছে আর কৃষি নেই– কৃষি এখন কর্পোরেটদের ঘরে। বললেন সোলেমান আহমেদ– এই তল্লাটে মাটি ও মানুষ নিয়ে কথা বলছেন।

কৃষককে বীজ কিনতে হচ্ছে বাজার থেকে, জৈবিক ব্যবস্থাপনাও তার ঘর থেকে কিনতে হচ্ছে। আবাার বালাই ষাটের বটিকা সিরাপও তার প্রতিনিধির কাছে ক্রয় করিতে হইবে। আর বিক্রির সময় নানা কিসিমের মধ্যস্বত্বভোগী খাড়ায়া আছে।

কৃষক আর সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারে না। কৃষকের হাত থেকে পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে গেলেই তার ডুপ্লেক্স বাড়ি খাড়ায়। অন্যদিকে ভোক্তার — যেখানে গিয়ে পণ্য নি:শেষ হয় তার পকেট সদর ঘাট।

জনসংখ্যার চাপে প্রান্তিক কৃষকের জমি খণ্ডিত জমি। পরম্পরা জ্ঞান দিয়ে যে কৃষক চাষাবাদে অভ্যস্ত ছিল সেটিকে আর কাজে লাগাতে পারছে না। অধিক লাভের আশায় যে হাইব্রিড ফলনের দিকে তার যে যাত্রা তা একদিকে জমির স্বাস্থ্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি প্রাণ ও প্রকৃতি হুমকির মুখে।

করোনার দাপটে আমরা বুঝেছি কত মেকি আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা। এক ভাইরাসেই বিশ্ব বিপন্ন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হুমকির মুখে। সনদের সংখ্যা বাড়লেও। কৃষি জ্ঞান বাড়েনি। কৃষক রোগ বালাই প্রতিরোধ করার যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি। সে কীটনাশক কোম্পানির দোকানির দিকে তাকাইয়া রইছে।

কৃষি উপ-সহকারি মোহাম্মদ ফজলুল হক হাত নেড়ে নেড়ে কৃষকদের বোঝাচ্ছে পরিবেশ বান্ধব কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যের জন্য “মনে রাখতে হবে পাঁচটি স।
১। সঠিক পোকা ২। সঠিক কীটনাশক ৩। সঠিক মাত্রা ৪। সঠিক নিয়ম ৫। সঠিক সময়।”

নইলে জমির যে জৈবিক ব্যবস্থাপনায় দরকারি পড়শি বোলতা মাকড়সা লেডিবার্ড বিটল ক্যারাবিড বিটল নিহত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাস্তুসংস্থান। আজকের টেকসই কৃষি সমগ্র প্রান ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত। কোনটাই বিচ্ছিন্ন নয়।

বালাই সহনশীল জাতের চাষ নিয়েও কথা উঠল। কৃষক দেলোয়ার সীম ক্ষেতে ধনে পাতা উৎপাদন করে দুটিতেই লাভবান হয়েছেন। ধনে পাতার উৎকট গন্ধে সীমের পোকাক্রান্ত হয়নি।

এই নিয়েই উঠানভরা কৃষক কৃষাণী নিয়ে উঠান বৈঠকের আয়োজন করেন জনউদ্যোগ — শেরপুর। সাথে ছিলেন শেরপুর জেলা প্রশাসন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। আইইডি।

জনউদ্যোগ একটি নাগরিক প্লাটফর্ম। পরিবেশ কৃষি নারী শিশু ও দলিতদের নিয়ে কাজ করা সামাজিক ভোকাল। গত বছর ১৭ নভেম্বর খুনুয়াতে তারা এই কৃষি ও পরিবেশ নিয়ে কাজকারবার শুরু করেন— স্থানিকের কেন্দ্রে নয়–পরিধিতে; কৃষক ও কৃষি ক্ষেতের পাশে।’

সূত্র : ফেসবুক থেকে সংগৃহীত