কবি- হাসান শরাফতের গল্প

0
42

হাসান শরাফত : সম্মানিত সুধী, আজ কবি এ এফ এম কায়সার হাবিব এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী । তিনি ছিলেন অত্র এলাকার গর্ব। তার কাব্য প্রতিভা ছিল অতুলনীয়। তার আদর্শকে ধারণ করে আজ আমরা কবি হওয়ার চেষ্টা করছি। তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতেন তাহলে হয়তো আমরা তাঁর কাছে সাহিত্যের অনেক অমূল্য সম্পদ উপহার পেতাম। তাই আমি আর সময় নষ্ট না করে গুণী এই কবির জীবনী থেকে আলোকপাত করার জন্য আহ্বান করছি বিশিষ্ট কবি, প্রয়াত কবির কাছের বন্ধু এম এইচ অনির্বাণ রায়সুল চৌধুরীকে।

সুধিমন্ডলী, আজ আমরা ঘটা করে পালন করছি কবি এ এফ এম কায়সার হাবিব এর মৃত্যুবার্ষিকী। অথচ বেঁচে থাকতে গুণী এই কবিকে আমরা মূল্যায়ন করেনি। তার প্রকাশিত বই ক্রয় করে তাকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করিনি। এবং প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরার পরও প্রকাশকেরা তাকে সুযোগ দেয়নি মফসল কবি বলে। অবশেষে অনেক কাঠখর পুড়িয়ে যখন তার বই প্রকাশিত হলো তখন তা ক্রয় করে তাকে উপযুক্ত সম্মান দিতে পারিনী। আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা নেই না।

সম্মানিত সুধী, আমাকে তার জীবন থেকে আলোচনা করতে বলা হয়েছে। কবি কায়সার হাবিব সম্পর্কে মোটামুটি আমরা সবাই জানি কিন্তু কবির জীবনে প্রথম কবিতার বই প্রকাশের এক ঐতিহাসিক বিরম্বনার কথা হয়ত অনেকেই জানিনা। অনেক চেষ্টার পর এক প্রকাশকের ঠিকানা নিয়ে বন্ধুবর কবি অবশেষে একবুক আশা নিয়ে পান্ডুলিপি নিয়ে হাজির হোন ঢাকায় প্রকাশকের দাড়প্রান্তে। শুনেছেন তিনি না কি অনেক ভাল মানুষ, মফসল কবিদের অনেক মূল্যায়ন করেন। অফেক্ষাগারে বসে বসে ভাবছেন, এইবার হয়ত আমার বইটি প্রকাশ হবে, সবাই আমাকে কবি হিসাবে চিনবে, সারাদেশে সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। আরও কয়েকজন কবিও এসেছেন সাক্ষাৎকারের জন্য, একজন মহিলা কবিও আছেন। অবশেষে প্রকাশক আসলেন, সরি একটু দেরি হয়ে গেল। আপনারা একটু অপেক্ষা করেন যিনি সাক্ষাৎকার নিবেন তিনি এখনও পৌঁছাননি। নামিদামী কবি মানুষ, তাদের তো তাগাদা দেওয়া যায়না। সময় দেওয়ার দু-তিন ঘন্টার মধ্যেই চলে আসেন।

এরই মধ্যে ঢাকার ধামরায় থেকে আরেক কবি সাক্ষাৎকারের জন্য হাজির হয়েছেন। তিনি এসেই বললেন, ছাক্ষাতকার কি ছুরু হয়ছেনি। খালি মাগার কবিগিরি করলেই তো হয়না, আমাদের ব্যবছা বানিজ্য আছে। রাতে আবার আবৃতি করতে হবে এক অনুষ্ঠানে, মুন্ত্রি ছাহেব অনুরোধ করেছেন। সেদিন আমার একটি কবিতা দৈনিক ভূমিকম্প পত্রিকায় প্রকাশের পর মুন্ত্রি ছাহেবের ইচ্ছা আমি যেন ছেই ঐতিহাসিক কবিতা আবৃতি করি। অবশেষে প্রতিক্ষার পালা শেষ হলো। ভেতর থেকে কেউ একজন বললেন, নতুন কবি ছাহেবদের ছাক্ষাতকার শুরু হবি, আপনেরা প্রস্তুতি নিন। তবে প্রথমে যাতি বলছেন মহিলা কবি ছাহেব কে। সাক্ষাতকার যেন আর শেষ হতে চায় না। অনেক প্রতিক্ষার পর অবশেষে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলল।

আসসালামু আলাইকুম স্যার।
ওয়াআলাইকুম সালাম, কি নাম আপনার?
আমার নাম এ এফএম কায়সার হাবিব।
সুন্দর, নামের মধ্যে কবি কবি ভাব আছে।
তা কবে থেকে লেখালেখি শুরু।
স্কুল জীবন থেকে, স্কুলের একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলাম।
ভাল, স্কুল জীবনে লেখালেখির কথা শুনে আমার বিরাট একটি ঘটনার কথা মনে হলো, অবশ্য সেই ঘটনাকে আমার বন্ধুরা ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে আখ্যায়িত করত। আমি তখন নবম শ্রেণীতে পড়ি। এম এন চৌধুরী হাইস্কুল, ধুলাইখাল, ঢাকা। আমার স্কুল জীবনের এক বড় ভাই তখন ভাল কবিতা লিখে। আমার পছন্দের মানুষ কি বলল জানো, বলেই হাসতে হাসতে পারলে চেয়ার থেকে পড়ে যান, কিছুতেই যেন হাসি থামছে না। আমি বললাম, তারপর স্যার।
ও, তারপর আমার ঐ ভাই এর কবিতা পড়ে আমার প্রিয়তমা মানে মোহনা তাকে পছন্দ করা শুরু করেছে আমার সন্দেহ হলো। এরপর থেকে আমিও লেখালেখি শুরু করলাম। প্রতিদিন মোহনাকে একটি করে প্রেমের কবিতা দেওয়া শুরু করলাম। কিন্তু মোহনা একদিন ডেকে বলল আগামীকাল একটি প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লিখবে এবং আমি স্কুলে যাওয়ার পথে আমাকে পৌঁছে দিবে। আমার মনে হলো, সে আমাকে সন্দেহ করেছে কবিতা আমি লিখি না কি ঐ বড় ভাই লিখে দেয়। আমি কোচিং এ এসেছি পড়তে হঠাৎ মনে হলো একটু পরেই তো এই পথ দিয়ে মোহনা স্কুলে যাবে। তাইতো কোচিং ক্লাসে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লেখা শুরু করলাম। কিছুতেই যেন কবিতা আসছে না। অবশেষে শুরু করলাম।

আম গাছে জাম ধরে
কাঠাঁল গাছে কলা,
গরু ঘাস খায়
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি।
কি অপরুপ প্রকৃতি,
আমার চোখে ঐ গরু ঐ প্রকৃতির চেয়েও
অনেক অনেক সুন্দর তুমি।
সুতরাং-
আমি তোমাকেই ভালোবাসি।

কোচিং শেষ করে স্কুলে গিয়ে দেখি মোহনা মিটমিট করে হাসছে। আমার মনটা ভরে গেল। যাক আজ প্রিয়া আমার কবিতা পছন্দ করেছে। এরই মধ্যে ক্লাসের বেল পরে গেল। বাংলা স্যার ক্লাসে এসেছেন। মোহনা সব সময় সামনের বেঞ্চে বসত। ভাল ছাত্রী ছিল, রোল-৩, মানবিক বিভাগ। স্যার এসে বেঞ্চের সামনে দিয়ে হাটতে হাটতে মোহনার বাংলা বইটি নিয়ে কি পড়া বলে পাতা উল্টাতে থাকলেন। এমন সময় পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমার লেখা কবিতাটি পেয়ে গেলেন। স্যার কবিতাটি হাতে নিয়ে কবির নামসহ পড়তে শুরু করলেন। সমস্ত ক্লাসে হাসির রোল পরে গেল। মোহনা মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল। আমাকে কথা বলতে গিয়ে স্যার নিজেই হেসে অস্থির হয়ে গেলেন।
সেদিন থেকে বন্ধুরা আমকে প্রকৃতির কবি বলে ক্ষেপাতেন। মোহনা স্কুল পরিবর্তন করে অন্য স্কুলে ভর্তি হলো।
এখন মোহনা কোথায় আছে জানো?
জি না স্যার।
আমেরিকা, বিরাট বড় লোক। নিজেই গাড়ী চালায়? ঐ দেশে তার একটি বই এর দোকান আছে। তার স্বামী ঐ দোকানে বসে। আমার লেখা বই ঐ দোকানে পাওয়া যায়। এখন আমাকে আজ দেশ বিদেশে সবাই চিনে। কবি এন এম এফ এ বদরুল তরফদার (৫ ও ২)।
৫ ও ২ এর মানে জানো?
জি না স্যার।
আন্তর্জাতিক পুরস্কার ৫ বার ও জাতীয় পুরস্কার ২ বার।
অনেক কথা হলো কবি সাহেব, আপনার পান্ডুলিপি রেখে যান, সিলেক্ট হলে ডাকা হবে। পরে এসে প্রভ দেখে যাবেন।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায় কিন্তু প্রকাশনী থেকে কোন ডাক আসেনা। এভাবে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে সারাটি জীবন ঘুরেছেন কবি এফএম কায়সার হাবিব। অবশেষে অনেক চড়াই উৎরাই এর পর তার একটি কবিতার বই প্রকাশ হলো। কবির আনন্দ যেন আর ধরে না। এই বুঝি কপাল খুলে গেল তার। কিন্তু তার বইয়ের কাটতি না থাকায় আর কোন সুযোগ দিলেন না প্রকাশক। এক বুক কষ্ট আর অভিমান নিয়ে কবি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন। চারদিকে আলোচনা শুরু হয়ে গেল স্বনামধন্য কবি এ এফএম কায়সার হাবিব আর বেঁচে নেই। ঐ বছরের বই মেলায় কবির বই এত বেশি বিক্রি হলো যে, পর পর তিনবার সংস্করন করতে হয়েছে। পরের বছর বইমেলার আগে প্রকাশক নিজেই এলেন কবির বাড়িতে তার মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া অবশিষ্ট লেখার খোজেঁ।

লেখক : হাসান শরাফত