একজন সংগ্রামী মা’য়ের গল্প…!

0
47

১৭ এপ্রিল শনিবার দুপুরে সীমান্তের একটি বিশেষ খবরের তথ্য পেয়ে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নেই সে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং যদি সত্যি হয় তবে তা জেনে নিয়ে আসার জন্য। জেলায় লক ডাউন চলছিলো তাই বাইক না নিয়ে একটি অটো রিক্সা রিজার্ভ ভাড়ায় দুপুরেই চলে গেলাম ঝিনাইগাতি উপজেলার সীমান্ত গ্রাম হলদি গ্রামের শেষ সীমান্তে। তাৎক্ষনিক ভাবে সাথে ছিলো আমার বন্ধু সহকর্মী কাজি মাসুম। ভারতের মেঘালয়ের সিসিংপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের সন্নিকটে বাংলাদেশের শেষ পাহাড়ের চূড়ায় যখন উঠবো এবং তথ্যটি জানার জন্য জনমানব শূণ্য পাহাড়ি টিলা ঘেরা আকাবাঁকা পথে হেঁটে যাচ্ছিলাম তখন একজন মহিলাকে দেখলাম দুটি গরু নিয়ে তার বাড়ির দিকে ফিরছে। কাছে যেতেই চিনে ফেললাম মহিলাটিকে। এর আগে বেশ কয়েকবার এই এলাকায় আসা হয়েছে আমার। সে কারণে মহিলাকে চিনতে অসুবিধা হয়নি। কুশলাদি জানার পর আমার তথ্যেও কোন ক্লু না পাওয়ায় তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাই একে বারে সীমান্তের কাঁটাতারের কাছাকাছি সিসিংপাড়া ক্যাম্পের কাছে। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কোন লোকজন না পেয়ে এবং তথ্যটি হয়তো ঠিক না ভেবে ফিরে আসতে সেই পথ দিয়েই রওনা হলাম।

এমনিতেই রোজার দিন তার উপর পাহাড়ি নির্জন রাস্তা ও আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত ছিলো। ফলে দুই টা পাহাড় বেয়ে উঠায় আমরা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই একটু আস্তে ধিরেই পথ চলছিলাম। এমন সময় আমরা পাহাড় ঘেষা যে রাস্তায় হাঁটছিলাম ঠিক তার উল্টো পাশের পাহাড়ের ঢালুতে একটি সবজি ক্ষেতের পাশে দাড়িয়ে ওই মহিলাটা আমাকে- ‘চাচা মিয়া এদিকে আহেন, কয়ডা সবজি নিয়ে যান’ বলে ডাকছিলো। ভাবলাম এই কাঠফাঁটা পড়ন্ত দুপুরে আর না দাড়িয়ে চলে যাই। কিন্তু মহিলাটি এমন ভাবে ডাকছিলো আর এগুতে পারলাম না। বাধ্য হয়েই তার কাছে গেলাম। বল্লাম এবার কেমন সবজি হয়েছে, বললো-‘কেবল হচ্ছে, তবে কাকরোল প্রায় আইসা গেছে, করলা, ঝিঙ্গা, বেগুন আরো পড়ে হইব।’ এসময় মহিলাটি আমাকে জোড় করে তার নতুন ক্ষেতের বেশ কিছু কাকরোল তুলে দিচ্ছিলো। দারুন মমতায় কাকরোল গুলো আমাকে দেয়ার জন্য তুলছিলো আর বলছিলো, ‘পুলাডা আফনেগো লাইগা এতো উচ্চতরে গেছে। আপনেগো ঋণ কি সোধা যাবো? কায়ডা সবজি নিলে আমার খুব ভালো লাগবো, না করেন ক্যা?’

গল্প লেখক : রফিক মজিদ

বুঝতে পারলাম এগুলো না নিলে তার মন খারাপ হবে। তাই ১০/১২ টা কাকরোল তুলার পরই নিষেধ করি আর লাগবে না, যখন ফলন বাড়বে তখন নিবো নি। এই বলে তার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে কাপালের ঘাম মুছতে মুছতে মহিলা বললো, ‘রাসেল ঢাকায় আছে, এহেনে থাইকা তো আর কিছু করবার পারবো না। শুনলাম পড়াশোনার নাকি চাপ আছে। কিন্তু ঢাকায় নাকি করোনার খুব জোড়। আল্লায় জানে পুলাডা কেমন আছে। আপনেরা একটু খোঁজ নিয়েন।’

মহিলার ছেলের নাম রাসেল। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজ বিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল ইয়ারে। বিসিএস এর জন্য প্রস্তুতি নিতে এবং নিজের আয়ের পথের সন্ধানে ঢাকায় একটি মেস ভাড়া নিয়ে থাকছে আর কয়েকটি প্রাইভেট পড়াচ্ছে। হল খুললে হলে উঠবে। রাসেল গত বছর লক ডাউনে গ্রামে এসে বিপদে পড়ে যায় আর্থিক সমস্যার কারণে। তাই গতবার সে নিজেই পাহাড়ি পরিত্যক্ত খাস জমিতে বেশ কিছু সবজির চাষ করে সামান্য কিছু আয় করেছিলো মায়ের সাথে। রাসেলের বাবা দীর্ঘ দিন থেকে অসুস্থ হয়ে শয্যাসায়ী। নিজেস্ব কোন জমি বা থাকার বসত ঘরও নেই। চাচার সামান্য একটু জমিতে বাঁশে বেড়া দিয়ে একচালা একটি ঘরের মধ্যে মা-বাবা ও ছোট বোনকে নিয়ে বসবাস করছেন তারা।

রাসেলের মা প্রতিদিন পাহাড়ে মড়া কাঠ সংগ্রহ করে আর খাস জমিতে সামান্য কিছু সবজি চাষ করে কোন রকমে সংসার চালিয়ে আসছিলো। এমন সময়ে দু’বেলা খেয়ে না খেয়ে পড়াশোনা করে রাসেল এসএসসিতে জিপি-৫ পেয়েও শিক্ষা জীবন থেকে ঝড়ে পড়ে। এসময় শেরপুরের ‘অসহায় ও দরিদ্র উন্নয়ন সংস্থা’ বা ‘ডপস’ এর প্রতিষ্ঠাতা সেনা সদস্য মো. শাহিন মিয়ার নজরে আসে। রাসেলকে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলে। কিছু সহযোগিতাও দেয় শাহিন মিয়া। এরপর এইচএসসিতেও রাসেল জিপিএ-৫ পয়েও সংসার ও জীবনের তাগিদে জন্য চলে যায় ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে। পড়াশোনা আবারও ছিটকে পড়ে সেখানে চাকুরি নেয়। এবারও শাহিন মিয়ার সহযোগিতায় আবারও শিক্ষা জীবনে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় রাসেল। এরপর আর পিছন ফিরে তাকায়নি রাসেল। ডপস এর সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বর্তমানে ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। এদিকে তার মা হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যাচ্ছে ছেলে ভাবিষ্যতে ভালো কিছু একটা করবে, সে আশায়।

রাসেলের মা এখন দুইটি গরু পালন এবং পাহাড়ি ওই পরিত্যাক্ত জমিতে সবজি চাষ করে কোন মতে জীবন ধারন করে যাচ্ছে। রাসেলের মা আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকার আমাগোর আশপাশে কত মাইনশেরে ঘর দিলো আমরা পাইলাম না। একটু জমি আর ঘর অইলে পুলাডা ঢাহা থাইকা আইসা একটু বিশ্রাম নিতে পারতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তার বন্ধুদেও এহানে আনবার পারে না ঘর-বাড়ি না থাকার কারনে।’ আমরা অনেক লেখালেখি এবং রাসেল বেশ কিছু দপ্তরে ভুমিহীন হিসেব সরকারী এক খন্ড জমি চেয়ে আবেদন করলেও আজো তার ফাইল অনুমোদন হয়নি অদৃশ্য কারণে। হয়তো সরকার দলীয় কোন তদবির না করতে পাড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন ভুমিহীনের একখন্ড জমি তার কপালে জুটেনি। আশা করি সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন রাসেলের মা’র আক্ষেপ দূর করবে।